ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

ধুনটে যমুনার ফের ভয়াল ভাঙন, নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে নদীপাড়ের মানুষ

ধুনট (বগুড়া) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

বগুড়ার ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রক্ষায় নির্মিত শহড়াবাড়ি স্পারে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। যমুনা যেন আবারও তার চিরচেনা রুদ্ররূপে ফিরে এসেছে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুর ১টার দিকে উপজেলার ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়নের শহড়াবাড়ি স্পারের প্রায় ৬৫ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর আগে গত ১২ জুলাই একই স্পারের অগ্রভাগের ৫০ মিটার অংশ নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। এবার নদীভাঙন ধেয়ে আসছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও জনবসতির দিকে।

বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় যমুনাপাড়ের পরিবারগুলো ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে তোলা বসতভিটা, স্মৃতি ও স্বপ্ন পেছনে ফেলে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে পা বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত চার দিন ধরে যমুনা নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নদীর পানি ১৫ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৮৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমতে থাকায় নদীতে প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়ে স্পারে আঘাত হানছে এবং ভাঙন তীব্র হচ্ছে।

কয়েকদিনের টানা স্রোত ও ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটছে নদীপাড়ের হাজারো মানুষের। গত দুই মাস ধরে প্রায় প্রতিদিনই নদীর পাড় ধসে পড়ার শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে কেউ ঘরের টিন খুলছেন, কেউ বাঁশ-কাঠ সরিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ ট্রলি কিংবা ভ্যানে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নিয়ে ছুটছেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। বৃদ্ধদের চোখে জমছে অশ্রু, আর পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যরা ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় নির্বাক হয়ে পড়ছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছরই যমুনার ভাঙনে সর্বস্ব হারাতে হয় তাদের। নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না। ফলে বর্ষা এলেই নতুন করে শুরু হয় আতঙ্ক, আর নদী কেড়ে নেয় মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, গাছপালা ও জীবিকার শেষ সম্বল।

নদীপাড়ের অনেক পরিবারের এখন একমাত্র চিন্তা মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ আশ্রয়। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন, কেউ বাঁধের ওপর কিংবা খোলা জায়গায় অস্থায়ীভাবে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাওয়ার কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। যে উঠোনে শিশুদের হাসি-কান্না, যে আঙিনায় ছিল জীবনের অসংখ্য স্মৃতি, সেটিই এখন নদীর গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়।

এদিকে ভাঙন যদি একই গতিতে অব্যাহত থাকে, তবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং নতুন করে দুর্ভোগে পড়তে পারেন হাজারো মানুষ। কারণ একটি ঘর ভেঙে গেলে শুধু ইট, কাঠ কিংবা টিন হারায় না; হারিয়ে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার অবলম্বন।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মালেক বলেন, শহড়াবাড়ি স্পারের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে বালুভর্তি জিওব্যাগ ও জিওটিউব ফেলে দ্রুত ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।

যমুনার এই অব্যাহত ভাঙন যেন আর কোনো পরিবারকে নিঃস্ব না করে—এটাই এখন নদীপাড়ের মানুষের সবচেয়ে বড় আকুতি।