বুক ভরা আশা নিয়ে বিদেশ পাড়ি দেওয়া আবুল খায়ের বাড়ি ফিরেছেন ঠিকই কিন্তু জীবিত নয় কফিনবন্দি হয়ে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২২ দিনের মাথায় শনিবার সকালে তার মরদেহ নিজ জন্মভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় উপজেলার মোগড়া গ্রামে আনা হয়। সেখানে বাদ জোহর জানাজা শেষে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়। তাকে অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষ বিদায় দিলেন আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া প্রতিবেশীরাসহ ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ।
এর আগে ভোরে একটি ফ্লাইটে তার মরদেহ হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে সেখান থেকে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন। এরপর সড়ক পথে নিহতের মরদেহ একটি লাশবাহী অ্যাম্বুল্যান্সে করে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। নিহতের মরদেহ সকালে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে শুরু হয় শোকের মাতম। পরিবার-পরিজন আর স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। নিহতের মরদেহ এক নজর দেখেতে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনসহ এলাকার শত শত লোকজন তার বাড়িতে ভিড় করেন। আবুল খায়ের মোগড়া গ্রামের আব্দুল জাব্বারের ছেলে। তার পরিবারে স্ত্রী ও ১ ছেলে রয়েছে।
এদিকে আবুল খায়েরের একমাত্র সন্তান আরহামকে নিয়ে সবার দুশ্চিন্তা। আরহামের বয়স এখন ১৫ মাস। আধো আধো কণ্ঠে ‘বাবা, বাবা’ বলে ডাকে। বাবার সঙ্গে ভিডিওকলে তার সখ্যতা গড়ে উঠছে কেবল! এরই মধ্যে বাবা নামের বটবৃক্ষ হারিয়েছে সে। ছোট্ট আরহামের জন্মের আগেই কিরগিজস্তানে পাড়ি জমান বাবা আবুল খায়ের (৪২)। তাই জীবিত বাবাকে কখনো ছুঁতে পারেনি আরহাম।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পরিবারের অভাব দূর করতে সুখের স্বপ্ন নিয়ে ২০২৪ সালের জুন মাসে বিয়ের মাত্র ৫ মাসের মাথায় পাড়ি জমান কিরগিজস্তানে। গত ২০ মার্চ দুপুরে ইটভাটায় কাজ করার সময় হঠাৎ করে মাটির স্তুপে ধ্বসে পড়ে খায়েরের ওপর। সহকর্মীরা তাকে উদ্ধারের আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। শেষ হয় তার জীবন-সংগ্রাম। পরে মৃত্যুর বিষয়টি সেখান থেকে বাড়িতে জানানো হয়। তার মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছানো হলে পরিবারের আহাজারিতে আকাশ ভারি হয়ে উঠে।
খায়েরের বড় ভাই রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘খায়েরের সহায়-সম্পদ বলতে কিচ্ছু নেই। বিদেশ যাওয়ার জন্য শেষ সম্বল বাড়ির জায়গাটুকুও বিক্রি করে দিয়ে গেছে। পরে তার স্ত্রী-সন্তানকে থাকার জন্য আমি আমার জায়গায় ঘর করতে দিয়েছি। এখন আরহামকে নিয়ে তার স্ত্রী কিভাবে চলবে সেটা নিয়ে আমাদের চিন্তা। স্থানীয় সংসদ সদস্য যেন এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেন সেই দাবি জানাই।
পরিবারের সদস্যরা জানান, কিরগিজস্তান যাওয়ার আগে কিছুদিন সৌদি আরবে ছিলেন খায়ের। কিন্তু সেখানে সুবিধা করতে না পেরে দেশে ফেরত চলে আসেন। এরপর বছর দেড়েক বাড়িতে থাকার পর ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে ঢাকার বনানী এলাকার একটি এজেন্সির মাধ্যমে কিরগিজস্তান যান। এজেন্সি থেকে সিরামিক কারখানায় কাজ দেওয়ার কথা বলা হলেও সেখানে গিয়ে সেই কাজ পাননি।
আবুল খায়েরের স্ত্রী হামিদা আক্তার বলেন, ঘটনার দিন (২০ মার্চ) সকালে ফোন করেছিল খায়ের। আমি বলেছিলাম কাজে যাবে কি না, বলেছিল যাবে না। এরপর ছেলেকে দেখেছে। পরে আবার একবার ফোন করে কথা বলেছে। এরপর সারাদিন আর কথা হয়নি। বিকেলে ফোন করার পর তার সঙ্গে কাজ করা একজন ফোন রিসিভ করেছে। আমার সঙ্গে কথা না বলে আমার ভাসুরের সঙ্গে কথা বলেছে। একপর্যায়ে জানিয়েছে, খায়ের কাজ করার সময় বুকে ব্যথা পেয়ে মারা গেছে। তার উপার্জনেই সংসার চলতো। এখন আমার পরিবারে বিপর্যয় নেমে এসেছে। ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে কীভাবে কী করব- কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।
স্থানীয় বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, আবুল খায়ের খুবই একজন ভালো লোক ছিল। সে সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতো। সে প্রবাসে থাকলেও সব সময় এলাকার মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখতো। সে এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে তা কখনো ভাবতে পারছি না।


