চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চামড়াশিল্প বর্তমানে গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। একসময় এ অঞ্চলে ২২টি ট্যানারি থাকলেও এখন টিকে আছে মাত্র একটি। অর্থসংকট, পরিবেশগত জটিলতা, কমপ্লায়েন্স সংকট এবং ঢাকাকেন্দ্রিক ট্যানারি ব্যবসার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন চট্টগ্রামের শত শত চামড়া ব্যবসায়ী।
১৯৮৮ সাল থেকে চামড়া ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মুসলিম উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামের অধিকাংশ ব্যবসায়ীই পূর্বপুরুষের হাত ধরে এ পেশায় এসেছেন। পাকিস্তান আমল থেকেই এ অঞ্চলে চামড়াশিল্পের ঐতিহ্য রয়েছে। স্বাধীনতার পরও চট্টগ্রামে ২২টি ট্যানারি চালু ছিল। কিন্তু অর্থসংকট, পরিবেশগত সমস্যা এবং বিগত সরকারের ভুল নীতির কারণে একে একে সব ট্যানারি বন্ধ হয়ে যায়।
চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির নেতারা জানান, বর্তমানে চট্টগ্রামে মাত্র একটি ট্যানারি চালু রয়েছে। ফলে পুরো ব্যবসা ঢাকানির্ভর হয়ে পড়েছে। ঢাকার ট্যানারি মালিকদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও মর্জিমাফিক দামের কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতির মুখে রয়েছেন।
সম্প্রতি আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে আড়তদার সমিতির নেতারা দাবি করেন, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে বছরের পর বছর বকেয়া আটকে আছে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০ কোটি টাকার পাওনা আদায় হয়নি। এতে অন্তত দুই শতাধিক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন।
বোয়ালখালীর ব্যবসায়ী সামশুল আলম বলেন, বড় অঙ্কের বকেয়া আটকে থাকায় তিনি পুঁজি হারিয়েছেন। ঋণ ও ধারদেনার চাপে পড়ে জমিজমা বিক্রি করেও পৈতৃক ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম বড় কাঁচা চামড়ার বাজার। প্রতি বছর ঈদুল আজহায় এখানে সাড়ে তিন লাখ থেকে চার লাখ পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। তবে করোনাকালে পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটে। ২০১৯ ও ২০২০ সালে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেকে রাস্তায় ফেলে দেন। পরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন দেড় লাখের বেশি চামড়া রাস্তা থেকে সংগ্রহ করে ডাম্পিং করে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারার অন্যতম কারণ হচ্ছে কমপ্লায়েন্স সংকট। ঢাকার সাভার চামড়াশিল্প নগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) ত্রুটি, আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদের অভাব এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের চামড়াশিল্প পিছিয়ে পড়ছে। ফলে ইউরোপ ও আমেরিকার বড় ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশি চামড়া কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছে।
চট্টগ্রামের একসময়কার নামকরা প্রতিষ্ঠান মদীনা ট্যানারিও পরিবেশগত জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক হাজি আবু মোহাম্মদ বলেন, একসময় আমেরিকা, ইতালি, স্পেন, জাপান ও কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চামড়া রপ্তানি করা হতো। কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত ও নীতিগত ব্যর্থতায় এ শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
বর্তমানে চট্টগ্রামে টিকে থাকা একমাত্র ট্যানারি হচ্ছে রিফ লেদার ট্যানারি। টি কে গ্রুপের সহযোগী এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯১ সালে কালুরঘাট শিল্পাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক মানের এলডব্লিউজি সনদ থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববাজারে প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও জুতা রপ্তানি করতে পারছে।
রিফ লেদারের পরিচালক মোখলেসুর রহমান বলেন, এলডব্লিউজি সনদ ছাড়া ইউরোপের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো চামড়া বা চামড়াজাত পণ্য কেনে না। সনদ থাকায় তারা আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো দাম পাচ্ছেন।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী-আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামে বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্যানারিগুলো দ্রুত চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী চামড়াশিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।

