টানা ভারি বর্ষণ ও মৌসুমি স্থল নিম্নচাপের প্রভাবে চট্টগ্রামে আবারও পাহাড়ধসের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলার ৩৪টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী এক লাখেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে সোমবার (৬ জুলাই) সকাল থেকে মাইকিং করছে জেলা প্রশাসন। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রও। তবে প্রতি বর্ষায় প্রশাসনের তৎপরতা বাড়লেও বছরের বাকি সময়ে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ ও ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগের অভাব নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীর সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীর সরকারি ও বেসরকারি ৩৪টি পাহাড়ে বিপজ্জনক অবস্থায় বসবাস করছে এক লাখেরও বেশি মানুষ।
জেলা প্রশাসনের হালনাগাদ তালিকা বলছে, নগরীর ২৬টি সরকারি ও বেসরকারি পাহাড়ে রয়েছে ৬ হাজার ৫৫৮টি অবৈধ স্থাপনা। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মালিকানাধীন ১৬টি পাহাড়ে বসবাস করছে ৬ হাজার ১৭৫টি পরিবার এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০টি পাহাড়ে রয়েছে আরও ৩৮৩টি পরিবার।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোর মধ্যে রয়েছে বায়েজিদ লিংক রোড, সলিমপুর, আকবর শাহ, অক্সিজেন, রৌফাবাদ, লালখান বাজারের মতিঝর্ণা এবং ফয়েস লেক এলাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন ফয়েস লেকের ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল পাহাড়েই বসবাস করছে ৪ হাজার ৪৭৬টি পরিবার। এ ছাড়া রেলওয়ের আরও কয়েকটি পাহাড়েও শত শত পরিবার বসবাস করছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু মতিঝর্ণা, টাংকির পাহাড়, বাটালি হিল ও টাইগারপাস এলাকায়ই ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষের বসবাস।
পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বছরের পর বছর পাহাড় দখল করে ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। পরে সেসব ঘর নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের অভাবেই অবৈধ বসতি পুরোপুরি উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ১১ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জন নিহত হওয়ার পর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও অবৈধ বসতির তালিকা প্রণয়ন শুরু হয়। এরপর গত ১৭ বছরে চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের এলাকায় পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন মোট ২৫১ জন।
সর্বশেষ ২০২৩ সালে ষোলশহরের আইডব্লিউ কলোনিতে পাহাড়ধসে বাবা ও সাত মাস বয়সী এক শিশুকন্যার মৃত্যু হয়। একই বছর আকবর শাহ এলাকায় আরও একজন নিহত হন। এর আগে ২০২২ সালে আকবর শাহ ও ফয়েস লেক এলাকায় পাহাড়ধসে চারজনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ২০০৮, ২০১১, ২০১২, ২০১৫, ২০১৮ ও ২০১৯ সালেও বিভিন্ন পাহাড়ধসে বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
মৌসুমি স্থল নিম্নচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সোমবার সকাল থেকে জেলা প্রশাসন নগরের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং শুরু করেছে। এর আগে রোববার রাতেও সতর্কতামূলক প্রচারণা চালানো হয়।
আকবর শাহ ঝিল ১, ২ ও ৩ নম্বর এলাকা, বিজয়নগর পাহাড়, শান্তিনগর, বেলতলীঘোনা, টাংকির পাহাড়, আমিন জুট মিল এলাকা, পাহাড়িকা, সমবায় আবাসিক এলাকা, মিয়ার পাহাড়, মুরাদপুর রেলস্টেশন-সংলগ্ন পাহাড়, মতিঝর্ণা, লালখান বাজারের পোড়া কলোনি, ঢেবারপাড়, আমবাগান এবং উত্তর হালিশহর উপকূলসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেতের পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় মাইকিং করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে।

