কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ভুল তথ্য বা ‘হ্যালুসিনেশন’ কমানোর উপায়, স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ, ব্লকচেইনভিত্তিক নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা এবং বন্যাকালে ড্রোনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ত্রাণ বিতরণ—এমন নানা উদ্ভাবনী গবেষণার ধারণা নিয়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গবেষকেরা অংশ নেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) গবেষণা উৎসবে। তবে এসব গবেষণার মূল ভাবনা উপস্থাপনের জন্য তাদের হাতে ছিল মাত্র তিন মিনিট।
শনিবার (১৮ জুলাই) চুয়েটের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ‘সাইব্লিটজ ২.০’-এর অন্যতম আকর্ষণ থ্রি মিনিট থিসিস (3MT) প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক 3MT ফরম্যাট অনুসরণে প্রতিযোগিতাটির আয়োজন করে আইইইই চুয়েট স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চ।
এবারের প্রতিযোগিতায় দেশের ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭টি দল অংশ নেয়। অংশগ্রহণকারীদের একটি মাত্র স্থির স্লাইডের সাহায্যে তিন মিনিটের মধ্যে নিজেদের গবেষণার সমস্যা, প্রস্তাবিত সমাধান, গবেষণা পদ্ধতি এবং সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরতে হয়। জটিল গবেষণাকে সহজ, সংক্ষিপ্ত ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের দক্ষতার ভিত্তিতে বিচারকরা প্রতিযোগীদের মূল্যায়ন করেন।
প্রতিযোগিতায় এআইয়ের নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধির একটি গবেষণায় দেখানো হয়, ভুল বা অস্পষ্ট নির্দেশনার কারণে এআই অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য তৈরি করে। প্রায় ২৮ হাজার পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানান, আরও উন্নত এআই তৈরির চেয়ে কার্যকর প্রম্পট বা নির্দেশনা ব্যবহারের মাধ্যমে এ সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
কম্পিউটার আর্কিটেকচারভিত্তিক আরেকটি গবেষণায় মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে প্রসেসরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বাড়ানোর নতুন পদ্ধতি উপস্থাপন করা হয়। পারসেপট্রনভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রসেসরের ভুল ব্রাঞ্চ অনুমান কমিয়ে কর্মক্ষমতা ও গতি বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়।
স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক একটি গবেষণায় ছিল ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ। মাইক্রোনিডল প্রযুক্তিনির্ভর এ প্যাচ স্মার্টফোনের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসুলিন সরবরাহ করতে পারে। গবেষকদের মতে, এ প্রযুক্তি রোগীদের বারবার ইনজেকশন নেওয়ার প্রয়োজন কমিয়ে চিকিৎসাকে আরও সহজ ও আরামদায়ক করবে।
এ ছাড়া স্ব-নিরাময়কারী (সেলফ-হিলিং) উপাদান নিয়ে একটি গবেষণাও দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এতে এমন উপাদানের ধারণা তুলে ধরা হয়, যা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিশেষ রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমে নিজেই নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের উপাদান নির্মাণ, পরিবহন ও ইলেকট্রনিক্স শিল্পে পণ্যের স্থায়িত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় ও ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রবাসী কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে ‘সেইফপাস’ নামে ব্লকচেইনভিত্তিক একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও উপস্থাপন করা হয়। এতে নিরাপদ ডিজিটাল পরিচয়, স্মার্ট কন্ট্রাক্ট, রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ এবং যাচাইকৃত নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দালালনির্ভরতা ও প্রতারণা কমানোর একটি কাঠামো তুলে ধরা হয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরেকটি গবেষণায় বন্যাকালে ড্রোনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থার ধারণা উপস্থাপন করা হয়। ক্লাউডভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ড্রোন নির্ধারিত স্থান থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করে জিপিএসের সহায়তায় দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিতে পারে। গবেষকদের দাবি, এ ব্যবস্থা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় দ্রুত, কার্যকর এবং পরিবেশবান্ধব।
আয়োজকরা জানান, গবেষণাকে সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের দক্ষতা গড়ে তুলতে ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডে ‘থ্রি মিনিট থিসিস (3MT)’ প্রতিযোগিতার সূচনা হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ প্রতিযোগিতা ব্যাপক জনপ্রিয়।
প্রতিযোগিতা শেষে আয়োজিত বিশেষ স্পিকার সেশনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, স্মার্ট অবকাঠামো, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা নিয়ে বক্তব্য দেন আমরার্ক লিমিটেডের চেয়ারম্যান জিসু পার্ক, প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাফায়াত আজিজ চৌধুরী, রবি আজিয়াটা পিএলসির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (কোর অপারেশনস) মো. আব্দুস সবুর শান্ত, ট্রমা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ডা. রিভু রাজ চক্রবর্তী, সিমেন্স বাংলাদেশের ম্যানেজার মিঠু কুমার ভৌমিক, ই-সফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল হাসান অপু এবং লাইটক্যাসল পার্টনার্সের প্রিন্সিপাল বিজনেস কনসালট্যান্ট ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার ওমর ফারহান খান।
অংশগ্রহণকারী বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তীব্র পাল বলেন, এখানে অংশ নিয়ে খুব ভালো লেগেছে। পুরো আয়োজন ছিল সুন্দর ও সুশৃঙ্খল।
চুয়েট আইইইই স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের সভাপতি মো. ইনজামাম উল হক সিয়াম বলেন, গত বছর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে ‘থ্রি মিনিট থিসিস’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সাইব্লিটজের যাত্রা শুরু হয়। এবার আমরা মোট নয়টি দলকে পুরস্কার ও গবেষণা-সহায়তার সুযোগ দিচ্ছি। এই প্রতিযোগিতা শুধু চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, গবেষণার ধারণা রয়েছে—এমন সবার জন্য উন্মুক্ত। এটি গবেষণায় আগ্রহী তরুণদের জন্য একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম।
এর আগে উৎসবের প্রথম দিনে হ্যাকাথন, স্টেম বি এবং প্রজেক্ট শোকেস প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এসব আয়োজনে শিক্ষার্থীরা এআইভিত্তিক সমাধান, বৈজ্ঞানিক ধারণা এবং বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রকল্প উপস্থাপন করেন।

