ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

হাতকড়া পরেই মায়ের জানাজা, দু’দিন পর বাবার মৃত্যু

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০৩:১৬ এএম
হাতে হাতকড়া নিয়ে মায়ের খাটিয়া কাঁধে তুলে দাফনের জন্য নিয়ে যাচ্ছেন দুই ভাই। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

কক্সবাজার কারাগারে বন্দি দুই সহোদর আড়াই মাস ধরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। বার্ধক্যজনিত কারণে মায়ের মৃত্যু হলে আদালতের অনুমতিতে পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পান তারা। পুলিশি পাহারায়, হাতে হাতকড়া নিয়েই মায়ের জানাজা ও দাফনে অংশ নেন। সেই ঘটনার দু’দিনের মাথায় মারা গেছেন তাদের বাবাও। শোকে স্তব্ধ পরিবার ও এলাকাবাসী।

ঘটনাটি কক্সবাজারের রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের। দুই ভাই ফরিদুল আলম (৪৩) ও মোহাম্মদ ইসমাইল (৩৮) বর্তমানে কক্সবাজার কারাগারে বন্দি। গত শনিবার সকালে তাদের মা মোস্তফা বেগম (৮০) বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান। স্বজনদের আবেদনের পর আদালতের অনুমতিতে পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় দুই ভাইকে।

সেদিন বেলা ১১টার দিকে তারা বাড়িতে পৌঁছে মায়ের মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে খাটিয়া কাঁধে তুলে দাফনের জন্য নিয়ে যান। পুরো সময়টিতে তাদের হাতে হাতকড়া ছিল। হাতকড়ার এক প্রান্ত দড়ি দিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশের হাতে বাঁধা ছিল—এ দৃশ্য উপস্থিত অনেকের চোখে জল এনে দেয়।

মায়ের জানাজার দুই দিনের ব্যবধানে গতকাল সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে মারা যান বাবা নূর আহমদ (৯০)। আজ মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের পানেরছড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদসংলগ্ন মাঠে তার জানাজা হওয়ার কথা রয়েছে। একই মাঠে গত শনিবার অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাদের মায়ের জানাজা। সেদিনই বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা জানিয়েছিলেন কারাবন্দি দুই ছেলে।

স্বজনরা জানান, ফরিদুল ও ইসমাইল নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে রামু থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। প্রথমে খুনিয়াপালং ইউনিয়নের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। ওই মামলায় জামিন পাওয়ার পর দক্ষিণ মিঠাছড়ির আরেক মামলায় পুনরায় আটক দেখানো হয়। সেখানেও জামিনের পর রামুর বিএনপি নেতা মাহিন চৌধুরীর দায়ের করা মামলায় আবার গ্রেপ্তার হন তারা। সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই মাস ধরে কারাভোগ করছেন দুই ভাই।

মায়ের জানাজার সময় অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে দুই ভাই দাবি করেন, তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন তারা।

ইসমাইলের স্ত্রী কুলছুমা বেগম বলেন, তার স্বামী নির্দোষ এবং কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। অহেতুক মামলায় জড়িয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মা–বাবা দুজনই মারা গেলেন, সন্তান হিসেবে শেষ সেবাটুকুও করতে পারলেন না—এ আক্ষেপ তার।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। তবে মা–বাবার শেষ বিদায়ে সন্তানের উপস্থিতি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা উচিত। একের পর এক দুই অভিভাবককে হারিয়ে কারাগারেই এখন দিন গুনছেন দুই সহোদর। তাদের জীবনে হাতকড়ার শিকল যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে।