× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার

প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম

পানি নেমেছে, তবে রয়ে গেছে বিপর্যয়ের গভীর ক্ষত

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার

প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

বন্যার পানি সরে গেছে। কিন্তু কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ জনপদে এখনো শুকায়নি মানুষের চোখের জল। ভেঙে পড়া ঘরের সামনে বসে ভবিষ্যতের হিসাব কষছেন কেউ, কেউ আবার কাদামাটিতে চাপা পড়ে যাওয়া ধানখেতের দিকে নির্বাক তাকিয়ে আছেন। কোথাও ভেঙে গেছে সড়ক, কোথাও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বেড়িবাঁধ। মাছের ঘেরে আর মাছ নেই, পুকুরে নেই পোনা, নলকূপে উঠছে না নিরাপদ পানি। পানি নেমে যাওয়ার পর কক্সবাজারে এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা—বেঁচে থাকার নতুন লড়াই।

সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১০ উপজেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি ইউনিয়ন এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার সদর, রামু ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। জেলার প্রায় ৪৪ শতাংশ এলাকা এবারের বন্যার কবলে পড়ে।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো শেষ হয়নি। কারণ অনেক দুর্গম এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলমান। ইতোমধ্যে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে স্পষ্ট—এটি শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং জেলার অবকাঠামো, কৃষি, মৎস্য, জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে।

ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, প্রাণহানি ৩০

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সাতটি উপজেলায় ৭ হাজার ৭১৩টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু পরিবার এখনো নিজেদের ঘরে ফিরতে পারেনি। যারা ফিরেছেন, তাদের অনেকের ঘরে নেই ব্যবহারযোগ্য আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। কাদামাটিতে ঢেকে গেছে বসতভিটা, নষ্ট হয়েছে বছরের সঞ্চয়।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার নিম্নাঞ্চল। পেকুয়া উপজেলার প্রায় ৯৫ শতাংশ, মাতামুহুরী এলাকার ৮৫ শতাংশ এবং চকরিয়ার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। অন্যান্য উপজেলারও বড় অংশ প্লাবিত হয়। কয়েক দিন ধরে এসব এলাকায় নৌকাই ছিল একমাত্র ভরসা। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অসংখ্য গ্রাম, থমকে যায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। পাহাড়ধস ও বন্যার পানিতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩০ জন।

অবকাঠামো খাতে ক্ষতি ২৮০ কোটি টাকা

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে যোগাযোগ অবকাঠামোতে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল হাসনাত মহিউদ্দিন জানান, বন্যায় ৫৮টি সেতু ও কালভার্টসহ বিভিন্ন সড়ক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ২৮০ কোটি টাকা।

জেলার বিভিন্ন সড়কে এখনো ভাঙনের চিহ্ন স্পষ্ট। কোথাও সড়ক ধসে গেছে, কোথাও কালভার্টের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ সব ধরনের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

৪৪ স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ

নদীভাঙন ও বেড়িবাঁধের ক্ষতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলার ৪৪টি স্থানে বেড়িবাঁধ ও নদীতীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে চকরিয়ার কোনাখালী এলাকায়। সেখানে প্রায় ২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে, যা ভবিষ্যতে জোয়ার ও অতিবৃষ্টির সময় নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামতের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিষয়েও কাজ চলছে।

কৃষিতে ৮৬ কোটি, মৎস্যে ৪৬ কোটি টাকার ক্ষতি

কৃষি খাতের ক্ষতি জেলার খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক জানান, ২ হাজার ৭৯১ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৪৬ হাজার ২১১ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কৃষি খাতে প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৬ কোটি টাকা। নষ্ট হয়েছে আমনের বীজতলা, মৌসুমি সবজি ও অন্যান্য আবাদি ফসল। অনেক কৃষকের সামনে এখন নতুন করে বীজ, সার ও কৃষিঋণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

মৎস্য খাতেও ক্ষতির পরিমাণ কম নয়। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, জেলার ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও মাছের খামার এবং ৪৫৬টি চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানিতে মাছ ভেসে যাওয়ায় ক্ষুদ্র খামারিরা কার্যত পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

জনস্বাস্থ্যে নতুন শঙ্কা

বন্যার পর জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নসরুল্লাহ জানান, জেলার বহু নলকূপ ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনো বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে নলকূপ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা জীবাণুমুক্ত করার কাজ শুরু হবে, যাতে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব রোধ করা যায়।

ত্রাণের পাশাপাশি চলছে পুনর্বাসন

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন এবং কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ বিতরণ করেন। পাশাপাশি পুলিশ, বিজিবি এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকেও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মন্নান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি পুনর্বাসন কার্যক্রমও চলছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন পরিকল্পনা নেওয়া যায়।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। মাতামুহুরী, বাঁকখালীসহ বিভিন্ন নদীর নাব্যতা সংকট, দুর্বল বেড়িবাঁধ, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ভবিষ্যতের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী ব্যবস্থাপনা, জলাধার সংরক্ষণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা ছাড়া এমন বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।

বন্যার পানি নেমেছে; কিন্তু শেষ হয়নি দুর্যোগ। পরিসংখ্যান শুধু টাকার অঙ্ক বলে, মানুষের হারানো স্বপ্ন, ভেঙে যাওয়া ঘর, ঋণের বোঝা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হিসাব কোনো সংখ্যায় ধরা পড়ে না। সেই অদৃশ্য ক্ষতির ভার নিয়েই কক্সবাজারের হাজারো পরিবার আজ নতুন করে বাঁচার সংগ্রামে নেমেছে।

Link copied!