ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬

ল্যাব থাকলেও হয় না ক্লাস, নষ্ট হচ্ছে ৩৮ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি

আলী আকবর, কুবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

ব্যবস্থপনা শিক্ষা, একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস, মার্কেটিং ও ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিংসহ চারটি বিভাগ নিয়ে চলছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ব্যবসায় অনুষদ। এসব বিভাগের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য একটি কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে। তবে স্নাতক শেষ হলেও সেই ল্যাবে ক্লাস করতে পারেনি এই অনুষদের শিক্ষার্থীরা। ক্লাস না করলেও দুই-তৃতীয়াংশ কম্পিউটার অকেজো হয়ে গেছে বলে জানা যায়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৩৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ব্যবসায় অনুষদের সব বিভাগ-ই ল্যাব ব্যবহার করতে পারে। তবে ব্যবহারের আগে অনুষদের ডিনের অনুমতির প্রয়োজন হয়। ২০২৪ সালে মার্কেটিং ও একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ যথাক্রমে চারটি ক্লাস নিয়েছে। ২০২৫ সালে ক্লাস নেয়ার কোনো আবেদন না থাকলেও শিডিউল ঠিক করা ছিলো তবে ২০২৬ সালে কোনো বিভাগ থেকেই ল্যাব ব্যবহার করা হয়নি। তবে মার্কেটিং বিভাগ একটি ক্লাস নিয়েছে। এই চার অনুষদের জন্য ব্যবহগত ল্যাবে কম্পিউটার আছে ৪৮ টি। তবে এরমধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই ওপেনই হয়না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

দপ্তর সূত্রে আরো জানা যায়, ল্যাবের জন্য নির্দিষ্ট কোনো রক্ষণাবেক্ষণকারী নেই। ডিন অনুষদের স্টাফরা-ই এটা দেখাশোনা করে।

মার্কেটিং বিভাগের ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহাদাত তানভীর রাফি বলেন, আমাদের অনার্স শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা কখনোই ল্যাব ক্লাস করার সুযোগ পাইনি।

ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. সিমান্ত মিয়া বলেন, চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আমরা কম্পিউটার ল্যাবে কোনো ক্লাস করতে পারিনি। অথচ এই ল্যাবটি আমাদের দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। প্রয়োজনীয় সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তা শিক্ষার্থীদের কাজে না লাগানো হতাশাজনক। ল্যাবের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত।

ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রোম্মানা হোসেন বলেন, আমাদের অনুষদে একটি কম্পিউটার ল্যাব থাকলেও কীভাবে বা কোন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এটি ব্যবহার করেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই। আমরা কখনো সেখানে ক্লাস করার সুযোগ পাইনি। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করতে ল্যাবটি সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত উন্মুক্ত করা প্রয়োজন।

অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হোসাইন মুহাম্মদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে কোনো ল্যাব সুবিধা পাইনি। বিভাগের ল্যাবভিত্তিক কোর্সগুলোও শুধু তাত্ত্বিকভাবে শেষ হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ল্যাব ব্যবহার করার সুযোগও আমাদের দেওয়া হয়নি।

মার্কেটিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মেহের নেগার বলেন, কম্পিউটার ল্যাব পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। ফলে যন্ত্রপাতিগুলোও ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যাচ্ছে। আবার ল্যাবে প্রজেক্টর না থাকায় শিক্ষকদের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে বিষয় বুঝিয়ে দিতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। এ কারণে অনেক শিক্ষক ল্যাব ক্লাস নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। বিষয়টি ডিনকে একাধিকবার জানানো হলেও এখনো কার্যকর সমাধান হয়নি। একজন টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ল্যাব ক্লাস করতে পারবে।

অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের বিভাগের ল্যাবভিত্তিক কোর্সগুলো মূলত অতিথি শিক্ষকরা পরিচালনা করেন। তাঁরা নিজ বিভাগের ল্যাবেই ক্লাস নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে যদি কোনো ব্যাচ ল্যাব ক্লাসের সুযোগ না পেয়ে থাকে, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।

ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. জি. এম. আজমল আলী কাওসার বলেন, আমাদের বিভাগে ল্যাবভিত্তিক কোর্স রয়েছে। যতদূর জানি, এসব ক্লাস ল্যাবেই হওয়ার কথা। কোথায় হয়েছে, তা খোঁজ নিয়ে দেখব। ভবিষ্যতে ল্যাবভিত্তিক ক্লাস যথাযথভাবে ল্যাবেই অনুষ্ঠিত হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের নতুন ডিন ও ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. এমদাদুল হক বলেন, ল্যাব ক্লাস হচ্ছে না—বিষয়টি সত্য। আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। শিক্ষার্থীরা যেন নিয়মিত ল্যাব ক্লাস করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন সরকার বলেন, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের কিছু কোর্সে কম্পিউটার ল্যাবভিত্তিক ক্লাসের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় কিছু কম্পিউটার বিকল হয়ে গেছে। সেগুলো সচল রাখতে একজন টেকনিশিয়ান নিয়োগের জন্য রিকুইজিশন দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ সম্পন্ন হলে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ল্যাব ক্লাস করতে পারবে। পাশাপাশি শিক্ষকরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ক্লাস নিতে পারবেন এবং শিক্ষার্থীরাও অ্যাসাইনমেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবহারিক কাজের জন্য ল্যাব ব্যবহার করতে পারবে।

আইসিটি সেলের ডাটাবেজ প্রোগ্রামার মো. মাসুদুল হাসান বলেন, ইলেকট্রনিক যন্ত্র দীর্ঘদিন ব্যবহার না করলে সেগুলো নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কম্পিউটারের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।

কম্পিউটার কেনার ব্যয় সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী এস. এম. শহিদুল হাসান বলেন, সব কম্পিউটার আমরা কিনিনি। ৪৮টির মধ্যে প্রায় ২০টি কম্পিউটার প্রকৌশল দপ্তরের তত্ত্বাবধানে কেনা হয়েছিল। ভ্যাট-ট্যাক্সসহ প্রতিটি কম্পিউটারের পেছনে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এম. শরিফুল করিম বলেন, বিষয়টি আজই জেনেছি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হবে। যেসব কম্পিউটার নষ্ট হয়েছে, সেগুলো দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে। অনুষদের নতুন ডিন দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।