ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

কাগজে-কলমে প্রথম শ্রেণি

সেবা বঞ্চিত লাকসাম পৌরসভা

লাকসাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ১১:৪৭ এএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

সরকার আসে, সরকার যায়। ক্ষমতার হাতবদল হয়, ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টায়, কিন্তু কিছু অঞ্চলের ভাগ্যলিপি যেন একই জায়গায় স্থবির হয়ে থাকে। এর অন্যতম বড় উদাহরণ কুমিল্লার লাকসাম পৌরসভা। খাতায়-কলমে এটি একটি ‘প্রথম শ্রেণি’র (ক্লাস-এ) পৌরসভা হলেও বাস্তবে দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা না থাকায় স্মার্ট পৌরসভার সুবিধা থেকে বঞ্চিত লাকসাম।  এখানকার বাসিন্দারা প্রথম শ্রেণির নাগরিক সুবিধা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত।

বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের মেয়র, কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেও রাস্তাঘাট ও ড্রেন-কালভার্ট সংস্কারের মতো রুটিন কাজের বাইরে আধুনিক পৌরসভা গঠনে দৃশ্যমান কোনো টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লার অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক কেন্দ্রটি আয়তন ও জনসংখ্যায় বাড়লেও নাগরিক সুবিধা মেলেনি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও শহর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি ‘আধুনিক ও পরিকল্পিত পৌরসভা’ হিসেবে লাকসামকে গড়ে তোলার জন্য যে দূরদর্শী উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল, তা বরাবরই উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

লাকসাম পৌরসভার অধিকাংশ এলাকায় এখনো পর্যন্ত কোনো আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা নিরবচ্ছিন্ন পাইপলাইনের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বাসিন্দাদের বাধ্য হয়ে নির্ভর করতে হচ্ছে ভূগর্ভস্থ আয়রন ও আর্সেনিকযুক্ত পানির ওপর। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন ও কালভার্ট নির্মাণ করা হলেও মাস্টারপ্ল্যানের অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই লাকসাম বাজারসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে কৃত্রিম জলজট দেখা দেয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পানি নিষ্কাশনের মূল আউটলেটের অভাবই এর প্রধান কারণ। সুনির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশন বা বৈজ্ঞানিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থা না থাকায় যত্রতত্র ফেলা বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কয়েক বছর আগে একটি ডাম্পিং স্টেশনের কাজ হাতে নেওয়া হলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। একটি প্রথম শ্রেণির আধুনিক পৌরসভায় যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকা আবশ্যক, তার অধিকাংশই অনুপস্থিত লাকসামে। এখানে নেই কোনো জাতীয় ঈদগাহ ও পরিচ্ছন্ন পৌর কবরস্থান, বিনোদন পার্ক, খোলা খেলার মাঠ কিংবা শিশু বিকাশ কেন্দ্র, প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল, শহরের অগ্নিনির্বাপণে ফায়ার হাইড্রেন্ট ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক একাডেমি ও সুইমিং পুল। এ ছাড়া লাকসাম জংশন ও দৌলতগঞ্জ বাজার এলাকায় তীব্র যানজট এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। সুনির্দিষ্ট বাস টার্মিনাল বা পার্কিং জোন না থাকা, অবৈধ ইজিবাইক ও মিশুকের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং ফুটপাত দখলের কারণে পথচারীদের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ঐতিহাসিক রেল জংশনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন বাণিজ্যিক শহরটির সম্ভাবনা ছিল অপার।  পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের প্রায় লক্ষাধিক মানুষের এই জনপদে বহুতল ভবন উঠলেও একটি ‘সচল, সুস্থ ও পরিবেশবান্ধব’ নগরের পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের মতে, জনপ্রতিনিধিরা কেবল ৫ বছরের নির্বাচনি মেয়াদ মাথায় রেখে তাৎক্ষণিক সংস্কার কাজ করেন। কিন্তু ৫০ বা ১০০ বছরের দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) না থাকায় স্মার্ট পৌরসভার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে লাকসাম। 

লাকসাম পৌরসভার বাসিন্দা জামাল আহমেদ বলেন, কেবল রাস্তাঘাট সংস্কার একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভার একমাত্র পরিচয় হতে পারে না। লাকসামকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট ও মানবিক শহরে রূপান্তর করতে হলে দলমত নির্বিশেষে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। সুপেয় পানি, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট নিরসন, সবুজায়ন এবং যেকোনো বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে ‘গণশুনানি’র মাধ্যমে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করাই এখন সময়ের দাবি। আগামীতে যারা পৌরসভার দায়িত্বে আসবেন, তাদের এখন থেকেই এই দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।

লাকসাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি জাফর আহমেদ বলেন, প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে নাগরিকদের ওপর সর্বোচ্চ হারে হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স ফি এবং অন্যান্য সেবা ফি আদায় হচ্ছে। করের বোঝা বাড়লেও সে অনুপাতে উন্নত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হয়নি। পরিকল্পিত বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থার অভাবে বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকায় ময়লা-আবর্জনাও জমে থাকে। বেশকিছু এলাকার রাস্তাঘাট খানাখন্দে ভরা এবং রাতের বেলায় সড়ক বাতি নিয়মিত জ্বলে না। কাগজে-কলমে বা আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখিয়ে একটি পৌরসভা প্রথম শ্রেণির সরকারি স্বীকৃতি পেতে পারে, কিন্তু নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত না হলে সেই স্বীকৃতির বাস্তবিক কোনো মূল্য থাকে না।