উত্তরাঞ্চলের জেলা দিনাজপুর দীর্ঘদিন ধরেই ধান ও লিচুর জন্য সুপরিচিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই জেলার লিচু বাগান ঘিরে তৈরি হয়েছে আরেকটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কার্যক্রম লিচুর ফুল থেকে মধু সংগ্রহ। লিচু মৌসুম এলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মৌচাষীরা এখানে ভিড় জমান। মৌমাছির বাক্স সাজিয়ে ফুলের মধু সংগ্রহে তারা কাটান ব্যস্ত সময়।
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার পাল্টাপুর ইউনিয়নের কাগল গ্রামের একটি লিচু বাগানে এখন তেমনই ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় তরুণ মৌচাষী মেহেদী হাসান। সারি সারি লিচু গাছের নিচে সাজানো কাঠের বাক্সে গুঞ্জন তুলছে হাজারো মৌমাছি। ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়িয়ে তারা সংগ্রহ করছে মধু, আর সেই মধুই হয়ে উঠছে মেহেদীর জীবিকা ও স্বপ্নের নতুন দিগন্ত।
পাল্টাপুর ইউনিয়নের পিকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মেহেদী হাসান প্রায় পাঁচ বছর আগে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) থেকে মৌচাষের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেই প্রশিক্ষণ থেকেই শুরু হয় তার নতুন পথচলা।

মেহেদী জানান, প্রথম দিকে মাত্র দুটি মৌমাছির বাক্স দিয়ে মধু সংগ্রহের কাজ শুরু করেছিলেন। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা ও সাহস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাক্সের সংখ্যাও বেড়ে যায়। বর্তমানে তার সংগ্রহে রয়েছে ২৫০টি মৌমাছির বাক্স। পাল্টাপুর ইউনিয়নে লিচুর ফুল থেকে মধু সংগ্রহের কাজ এখন মূলত তিনিই একাই করছেন।
লিচু ফুল ফোটার সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয় তাকে। মেহেদী জানালেন, প্রতিটি বাক্স থেকে সাধারণত ২-৩ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে তিনি প্রতি সপ্তাহে ১০-১২ মণ পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করতে পারেন।
তিনি বলেন, লিচু ফুলের মধুর স্বাদ ও ঘ্রাণ আলাদা হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা অনেক বেশি। তাই সংগ্রহ করা মধু খুব সহজেই বিক্রি হয়ে যায়। সংগ্রহ করা মধু তিনি স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বিভিন্ন কোম্পানির কাছেও সরবরাহ করেন।
মেহেদীর ভাষ্য অনুযায়ী, কোম্পানির কাছে লিচু ফুলের মধু বিক্রি করেন প্রতি মণ প্রায় ১৫ হাজার টাকায়, আর খুচরা বাজারে বিক্রি করেন প্রতি কেজি প্রায় ৫০০ টাকায়। তিনি আশা করছেন, চলতি মৌসুমে তার ২৫০টি বাক্স থেকে মোট ৪০-৫০ মণ মধু সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
মৌচাষে ব্যবহৃত এই বিশেষ প্রজাতির মৌমাছি ইউরোপ মহাদেশ থেকে বাংলাদেশে আনা হয় ১৯৮০ সালের দিকে। সে সময় বিসিক নিজস্ব উদ্যোগে মৌচাষ কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল এবং প্রায় ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে চাষ অব্যাহত রাখে।
পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালের পর থেকে এটি বাণিজ্যিকভাবে বিস্তার লাভ করে এবং ২০১০ সালের পর দেশজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে দেশে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি মৌচাষী এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
মৌচাষ শুধু মধু উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি লিচু গাছের ফলন বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মৌমাছি ফুলে বসে পরাগায়নের মাধ্যমে এক ফুল থেকে অন্য ফুলে পরাগ ছড়িয়ে দেয়। ফলে ফুল ঝরে পড়া কমে এবং ফলনও ভালো হয়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, দিনাজপুর অঞ্চলে লিচু বাগান বেশি হওয়ায় এখানে মৌচাষের ভালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। লিচু ফুলের সময় মৌমাছির উপস্থিতি বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই পরাগায়ন ভালো হয়, ফলে গাছে ফলনও বৃদ্ধি পায়।
একই সঙ্গে মৌচাষীরা লিচু ফুল থেকে উন্নতমানের মধু সংগ্রহ করতে পারেন, যা বাজারে ভালো দামে বিক্রি হয়। মেহেদী হাসানের মতো উদ্যোক্তারা এ খাতে এগিয়ে আসায় স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
গ্রামের একটি ছোট উদ্যোগ কীভাবে বড় সম্ভাবনায় রূপ নিতে পারে, তার উদাহরণ হয়ে উঠেছেন মেহেদী হাসান। দুইটি বাক্স দিয়ে শুরু করা তার মৌচাষ আজ ২৫০টি বাক্সে পৌঁছেছে। লিচু মৌসুম ঘিরে তার এই উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন