দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে গত বছরের তুলনায় আলুর বস্তার দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। চরম আকার ধারণ করেছে বস্তা সংকট। এর প্রভাব পড়েছে আলুর দামে। বস্তার দাম বেশি হওয়ায় গত দুই দিনে প্রতি কেজি আলুর দাম ২ থেকে ৩ টাকা কমে গেছে।
গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ক্যারেজ জাতের যে আলু প্রতি কেজি ১৫ থেকে ১৬ টাকা বিক্রি হয়েছে, শনিবার (৪ এপ্রিল) সেই আলুর দাম ১২ থেকে ১৩ টাকায় নেমেছে। তবু ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। বস্তার অভাবে বাড়ির পাশে আলু স্তূপ করে রাখছেন চাষিরা।
চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছর যে বস্তার দাম ছিল ৭৫ থেকে ৮০ টাকা, এবার সেই বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকায়। এতে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। তাদের অভিযোগ, পাটের দাম বৃদ্ধিসহ কিছু হিমাগার কর্তৃপক্ষ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বস্তার দাম বাড়াচ্ছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে উপজেলায় আলুর আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮ হাজার ৮০ হেক্টর জমিতে এবং চাষও হয়েছে প্রায় একই পরিমাণ জমিতে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন।
উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের পাঠকপাড়া গ্রামের আলুচাষি জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি এবার পৌনে চার বিঘা জমিতে ক্যারেজ জাতের আলু চাষ করেছেন। ফলন ভালো হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এক ব্যবসায়ী ১৫ টাকা কেজি দরে আলু কিনতে চেয়েছিলেন। শুক্রবার আলু নিতে আসার কথা থাকলেও বস্তা সংকটের কারণে তিনি আসতে পারেননি। ফলে বাড়িতেই কষ্ট করে আলু সংরক্ষণ করতে হচ্ছে।
উপজেলার রাজারামপুর গ্রামের আলুচাষি ও ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান বলেন, গত বছর ৭৫ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে বস্তা পাওয়া গেলেও এ বছর মৌসুমের শুরু থেকেই ১২০ টাকা করে বস্তা কিনতে হয়েছে। ঈদের এক দিন পর ১৬০ টাকায় বস্তা কিনেছেন। এখন দাম বেড়ে ১৮০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বস্তার অভাবে আলু কিনতে পারছি না।
মেলাবাড়ী এলাকার আলুচাষি আল আমিন বলেন, বস্তার অভাবে নিজের উৎপাদিত আলুর মধ্যে মাত্র ৬ বস্তা ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করতে পেরেছেন। বাকি আলু বিক্রি করতে না পেরে বাড়িতেই পড়ে রয়েছে।
রাজারামপুর মৎস্যপাড়া গ্রামের আলুচাষি মো. মামুন জানান, তার ২২৫ বস্তা আলু হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩১ বস্তা হিমাগারে রাখতে পেরেছেন। বাকি ১৯৪ বস্তার জন্য বস্তা পাচ্ছেন না। গত বছর যে বস্তার দাম সর্বোচ্চ ৮০ টাকা ছিল, এবার তা ১৮০ টাকায় উঠেছে। বস্তার সংকটের কারণে আলুর দামও কমে গেছে।
বারাইহাট এলাকার আলুচাষি কার্তিক চন্দ্র রায় ৩ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তার প্রায় ১৫০ বস্তা আলু হয়েছে। তিনি বুধবার (১ এপ্রিল) ১৬ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রির জন্য স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করে ৫ হাজার টাকা অগ্রিম নেন।
কিন্তু বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সেই ব্যবসায়ী জানান, ১৩ টাকার বেশি দরে আলু নিতে পারবেন না। শেষ পর্যন্ত অগ্রিম টাকাও ফেরত নেবেন না বলে জানিয়েছেন।
পৌরশহরের বস্তা বিক্রেতা সাজু সাহা বলেন, পাটের দাম বাড়ায় বস্তার দাম বেড়েছে। এছাড়া আলু সংগ্রহ মৌসুমে প্রতি বছরই বস্তার চাহিদা বাড়ে, ফলে দামও বাড়ে। তবে এবার দাম বেশি বেড়েছে এবং বস্তার সংকটও রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী বস্তা পাওয়া যাচ্ছে না।
ফুলবাড়ী পাইকারি আলু ব্যবসায়ী জয়ন্ত সাহা বলেন, কয়েক দিন আগেও ক্যারেজ জাতের আলু পাইকারি বাজারে ১৬ থেকে ১৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন তা ১২ থেকে ১৩ টাকায় নেমে এসেছে। বস্তা সংকটের কারণে আলু সংরক্ষণে সমস্যা হওয়ায় বাজারে দাম কমছে।
ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের প্রধান হিসাবরক্ষক আবুল হাসান জানান, কোল্ড স্টোরেজের ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৬৫ হাজার বস্তা (প্রতি বস্তা ৫৫ কেজি)। কিন্তু ইতোমধ্যে ১ লাখ ৭১ হাজার বস্তা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা ধারণক্ষমতার চেয়ে ৬ হাজার বস্তা বেশি। বস্তা সংকটের মধ্যেই সংগ্রহ কার্যক্রম শেষ করতে হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, এ ধরনের বস্তা সংকটের বিষয়ে কেউ তাদের অবহিত করেননি। তবে জানানো হলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো যেতে পারে।

