ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

চলে ২০ জোড়া ট্রেন, কিন্তু স্টপেজ না থাকায় অকার্যকর স্টেশন

গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ০১:১৭ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

প্রায় ৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গাজীপুরের হাইটেক পার্ক রেলওয়ে স্টেশনটি এখন কার্যত অচল ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। যাত্রীসেবায় কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারা, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে প্রকল্পটি এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এই স্টেশনটি বর্তমানে জনশূন্য পড়ে থাকায় এটি মাদকসেবী, ছিনতাইকারী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল, ঢাকা এবং উত্তরবঙ্গগামী প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার যাত্রীর যাতায়াতের লক্ষ্যে স্টেশনটি নির্মাণ করা হয়। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনের আদলে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কালিয়াকৈরের বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি সংলগ্ন এলাকায় এটি গড়ে তোলা হয় এবং ২০১৮ সালে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্বোধন করা হয়। বর্তমানে এটি “হাইটেক পার্ক স্টেশন” নামে পরিচিত।

নান্দনিক স্থাপত্য, একক প্ল্যাটফর্ম, লুপ লাইন ও আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থাসহ সব ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। উদ্বোধনের পর শুরুতে একটি ডেমু ট্রেন চলাচল করলেও করোনা মহামারির সময় তা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয়দের আন্দোলনের মুখে কিছু ট্রেনের অস্থায়ী যাত্রাবিরতি চালু হলেও বর্তমানে কেবল সকালে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনটি এখানে থামে।

অথচ এই রুট দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ জোড়া (৪০টি) ট্রেন চলাচল করলেও অধিকাংশ ট্রেনই এই স্টেশনে থামে না। ফলে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার মূল লক্ষ্যই ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুরু থেকেই প্রকল্পটিতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার অভাব ছিল। যাত্রী চাহিদা যাচাই না করেই বিপুল অর্থ ব্যয়ে স্টেশনটি নির্মাণ করা হয়েছে।

তাদের ভাষায়, প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রয়োজনীয় স্থানে স্টেশন নির্মাণ করে সরকারি অর্থের অপচয় করা হয়েছে। অনেকেই সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অর্থ লোপাটের সুযোগ তৈরি করতেই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে যাত্রী না থাকায় স্টেশনটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত। দিনের বেলাতেও জনসমাগম থাকে না, আর সন্ধ্যা নামলেই এলাকাজুড়ে নেমে আসে ভুতুড়ে নীরবতা। নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নেই জিআরপি পুলিশ বা নৈশপ্রহরী। ফলে মাদকসেবন, ছিনতাই, চুরি ও নানা অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে স্টেশনের বিভিন্ন মালামাল চুরির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।

স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার রেদোয়ানা বিনতে রাজ্জাক বলেন, “এই রুটে প্রতিদিন ২০ জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও আমাদের স্টেশনে মাত্র একটি ট্রেনের স্টপেজ রয়েছে। পর্যাপ্ত জনবল ও নিরাপত্তা না থাকায় সন্ধ্যার পর আমরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি।”

অন্যদিকে ট্রেন না থামায় গাজীপুর, কালিয়াকৈর, সাভারসহ আশপাশের এলাকার হাজারো যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেকেই স্টেশনে এসে ট্রেন না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে সময় ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি জনদুর্ভোগ বাড়ছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে প্রতি মাসে ৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে এই স্টেশনে। কিন্তু যাত্রী না থাকায় কোনো রাজস্ব আয় হচ্ছে না। ফলে এটি এখন রীতিমতো লোকসানী প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।

এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, এই স্টেশন দিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার প্রচুর যাত্রী রয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত করা হয়েছে। ট্রেনের যাত্রাবিরতি বাড়াতে রেল বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এ ধরনের বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করা এবং পরবর্তীতে পরিকল্পনার অভাবই এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি থাকলে এ ধরনের অচল অবকাঠামো তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

তারা দ্রুত এই স্টেশনে একাধিক ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালু, নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রকল্পটির সার্বিক ব্যবস্থাপনা পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান। একইসঙ্গে নির্মাণ ব্যয় ও পরিকল্পনা প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্তেরও দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের ভাষায়, কোটি কোটি টাকা খরচ করে এমন একটি স্টেশন বানানো হয়েছে, যা মানুষের কোনো উপকারেই আসছে না। এটি শুধু অর্থের অপচয় নয়, বরং জবাবদিহিতার বড় প্রশ্ন।