ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

গাজীপুরে আর্থিক সংকটে দুই পোশাক কারখানায় তালা, অনিশ্চয়তায় ১,৮০০ শ্রমিক

গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম
পুরোনো ছবি।

আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। হঠাৎ দুই কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল হারিয়ে চরম উদ্বেগ, হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে শ্রমিক ও তাদের পরিবারগুলোর।

কারখানা সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ জুন থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে সম্প্রতি কারখানা কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে স্থায়ী বন্ধের ঘোষণা দিলে শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে কারখানার শ্রমিক মো. মনির হোসেন বলেন, আমার বাড়ি সিরাজগঞ্জ। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থেকে এই কারখানায় চাকরি করতাম। হঠাৎ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা পথে বসে গেছি। ছেলে মেয়ে লেখাপড়া করিয়েছি, এখন তাদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এদিকে বৃদ্ধ বাবা মা অসুস্থ তাদের ঔষধ কিনে দিতে হয়। সামনে কী করব বুঝতে পারছি না। শুনেছি আগামী ২৭ জুলাই আমাদের সব পাওনা পরিশোধ করা হবে। আদৌ তা পাব কি না, সেটিও জানি না।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খলিলুর রহমান জানান, আর্থিক সংকটসহ নানা জটিলতার কারণে মালিকপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এদিকে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, সার্ভিস বেনিফিট এবং অন্যান্য আইনানুগ পাওনা পরিশোধের বিষয়ে গত রোববার (২১ জুন) সকালে গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় আপস-মীমাংসা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন।

বৈঠকে শিল্প পুলিশ, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডাইফ), শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা, মালিকপক্ষের প্রতিনিধি, বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ এবং শ্রমিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন। মালিকপক্ষের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ আহমেদ।

বৈঠক শেষে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শ্রমিকদের এপ্রিল মাসের অবশিষ্ট ১৫ দিনের বেতন এবং মে মাসের ১৮ দিনের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব বকেয়া বেতনও পরিশোধের কথা জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া চাকরি অবসানের কারণে শ্রমিকদের ৩০ দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ নোটিশ পে হিসেবে প্রদান করা হবে। চাকরির প্রতি বছরের জন্য ২০ দিনের মূল বেতন হারে সার্ভিস বেনিফিট দেওয়া হবে। প্রমাণ সাপেক্ষে মাতৃত্বকালীন সুবিধা, অর্জিত ছুটির অর্থ, পদত্যাগকারী শ্রমিকদের রিজাইন বেনিফিট এবং বিভিন্ন তহবিলে জমাকৃত অর্থও পরিশোধ করা হবে।

ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২৭ জুলাই শ্রমিকদের সব পাওনা একযোগে পরিশোধ করার কথা রয়েছে।

তবে এ চুক্তিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শ্রমিক নেতারা। জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুজ্জামান বলেন, ঈদের আগে বেতন-ভাতা ও বোনাস নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়। কিন্তু এরপরও মালিকপক্ষ কারখানা চালু না করে স্থায়ীভাবে বন্ধের পথ বেছে নিয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত শত শত শ্রমিক একসঙ্গে বেকার হয়ে পড়েছেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২১ জুনের চুক্তিটি পুরোপুরি শ্রমিকবান্ধব নয়। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের প্রাপ্য সব সুবিধা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে অনেক শ্রমিক তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।

স্থানীয় শ্রমিক নেতাদের মতে, গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে একের পর এক কারখানা বন্ধের ঘটনা শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে হাজারো শ্রমিক পরিবারের জীবিকা, সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এদিকে শ্রমিকরা দ্রুত তাদের পাওনা পরিশোধ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।