জামালপুরের বকশিগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চলগুলোতে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে যেন লাল গালিচা বিছানো হয়েছে। মাঠে-ঘাটে, খেতের পাশে যেখানেই ফাঁকা জায়গা, সেখানেই লাল গালিচার মতো দৃশ্য। তবে এটি আসল গালিচা নয়, খেতের পাশে কিংবা মিলের চাতালে শুকাতে দেওয়া লাল মরিচের সারি।
এভাবেই চলছে বকশিগঞ্জের চরাঞ্চলে মরিচ সংগ্রহ ও শুকানোর হিড়িক। বাজারে দাম ভালো থাকায় কৃষক-কৃষানিরা পরিবারের সবাইকে নিয়ে মরিচ সংগ্রহ ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
ধান, গম, পাট, ভুট্টা ইত্যাদি চাষ করে যেখানে কৃষকেরা প্রতি বছর লোকসান গুনছেন, সেখানে মরিচ চাষ করে লাভের মুখ দেখার আশা করছেন তারা। লাল মরিচের রঙের সঙ্গে এবার বকশিগঞ্জ উপজেলার কৃষকদের ভাগ্যও যেন লাল হয়ে উঠেছে।
তাই কৃষক পরিবারগুলো এখন সচ্ছলভাবে চলার এবং পাকা ঘর নির্মাণের স্বপ্ন দেখছে। কেউ কেউ মরিচ বিক্রির লাভের টাকা দিয়ে মেয়েকে ভালো ঘরে বিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
চলতি বছর বকশিগঞ্জ উপজেলায় ১৭০ হ্যাক্টর জমিতে মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে চাষিরা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত ১০ হ্যাক্টর জমিতে মরিচ আবাদ করেছেন। অর্থাৎ, মোট ১৮০ হ্যাক্টর জমিতে মরিচ চাষ করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসব জমি থেকে ৫১৫ ম্যাট্রিক টন শুকনা মরিচ উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উপজেলার বাইরেও বিক্রি করা হবে।
বাঙালপাড়া গ্রামের কৃষক মিনাল শেখ জানান, বকশিগঞ্জ উপজেলার কৃষকেরা ধান, গম, পাট ও ভুট্টা চাষ করে লোকসানের মুখে পড়লেও মরিচ চাষে লাভের আশা দেখছেন। তাই এ উপজেলার চাষিরা মরিচকে ঘাটতি পূরণের ফসল হিসেবে বিবেচনা করছেন। গাছে থোকায় থোকায় মরিচ পাকার কারণে পরিবারের সবাইকে নিয়ে মরিচ সংগ্রহে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।
শেখপাড়া গ্রামের মরিচ চাষি নাজিম উদ্দীন জানান, এক বিঘা জমিতে বিন্দু ও জলশই জাতের মরিচ চাষ, নিরানি, সেচ ও পরিচর্যা থেকে শুরু করে সংগ্রহ পর্যন্ত মোট ব্যয় হয় ১২-১৩ হাজার টাকা। ওই জমিতে কমপক্ষে ১৫ মণ মরিচ উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি মণ মরিচ ৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি করে বিঘাপ্রতি অন্তত ৪৫-৫০ হাজার টাকা মুনাফা করছেন তিনি।
বর্তমানে প্রতি মণ জলশই তথা বড় আকারের শুকনা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে। আর বিন্দু বা ছোট আকারের মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকারও বেশি দামে। আকারে ছোট হলেও বিন্দু মরিচ অতিরিক্ত ঝাল ও টকটকে লাল হওয়ায় এর চাহিদা বেশি এবং দামও তুলনামূলক বেশি।
কৃষক সুবাহান আলী জানান, এ বছর পোকার আক্রমণে মরিচের উৎপাদন কিছুটা কমেছে। তারপরও বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় অন্যান্য ফসলের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এবারের মরিচ বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি তার একমাত্র কন্যার বিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
এদিকে খেত থেকে মরিচ সংগ্রহের কাজে বিপুল সংখ্যাক নারী ও শিশু-কিশোরের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন একজন শ্রমিক গড়ে ৩-৪ মণ মরিচ সংগ্রহ করতে পারছেন। প্রতি মণে ১০০ থেকে ১৩০ টাকা হিসেবে তাদের দৈনিক আয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা।
এ বিষয়ে কৃষিবিদ আমিনুল ইসলাম বলেন, মরিচ চাষে ভালো দাম পাওয়ায় এ উপজেলার কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। এখানকার উৎপাদিত মরিচ উন্নত মানের হওয়ায় এর চাহিদাও সর্বত্র বেশি।
অন্যান্য ফসলে লোকসান হলেও মরিচ চাষে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। তাই এটি একটি অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কৃষকেরা নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত মরিচ বাইরে বিক্রি করে লাভ করছেন।



