ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সংযোগ সড়ক না থাকায় অচল ১৭ কোটি টাকার সেতু

শেখ মাহদী হাসান শিবলী, গোপালপুর (টাঙ্গাইল)
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৮, ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
মোটরসাইকেল ঠেলে উঠানো হচ্ছে পিসি গার্ডার সেতুটি দিয়ে। ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ঝিনাই নদীর ওপর ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত পিসি গার্ডার সেতুটি যানবাহন চলাচলে কোনো কাজে আসছে না। সেতুর উভয় পাশে অ্যাপ্রোচ রোড পাকা না থাকায় দুই জেলার মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সংযোগ সড়ক অংশে কিছু বালু ফেলে ঠিকাদার কাজ রেখে লাপাত্তা হয়েছেন।

জানা যায়, আশির দশকে নির্মিত ঝিনাই নদীর ওপর পুরোনো বেইলি ব্রিজটি অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে জরাজীর্ণ ও নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে গিয়ে একাধিক দুর্ঘটনায় হতাহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ পুরোনো বেইলি ব্রিজ ভেঙে প্রায় একশ ফুট দীর্ঘ একটি পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৪ সালের শুরুতে সেতুটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। কাজটি পায় ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন।

ঠিকাদার কামাল হোসেন জানান, কাজ শুরুর পর থেকেই চাঁদাবাজদের পাল্লায় পড়তে হয়। চাঁদার দাবিতে কর্মচারীদের একাধিকবার মারধরের ঘটনায় কিছুদিন কাজ বন্ধ রাখতে হয়। বর্তমানে সেতুর মূল নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও সওজের ফান্ড সংকটের কারণে বকেয়া বিল পরিশোধ না হওয়ায় আর্থিকভাবে তিনি চরম সংকটে পড়েছেন। ফলে সেতুর দুই পাশে ১২০ মিটার দীর্ঘ ড্রেইন নির্মাণ, নদীভাঙন রোধে ব্লক স্থাপন এবং অ্যাপ্রোচ রোড পাকা করার কাজ এখনো বাকি রয়েছে।

ঝাওয়াইল বাজারের ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম জানান, সেতুর পূর্ব পাড়ে টাঙ্গাইলের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র ২০১ গম্বুজ মসজিদ অবস্থিত। প্রতিদিন, বিশেষ করে শুক্রবার ও ছুটির দিনে, হাজারো পর্যটক নামাজ আদায় ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে সেখানে আসেন। কিন্তু টানা দুই বছর ধরে সেতু নির্মাণকাজ চলমান থাকায় কোনো যানবাহন নদীর পশ্চিম পাড়ে যেতে পারছে না। বর্ষা মৌসুমে নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে বাঁশের সাঁকো দিয়েই মানুষ পারাপার হচ্ছে।

নদীর পশ্চিম পাড়ে ঝাওয়াইল বাজার ছাড়াও একটি বয়েজ ও একটি গার্লস হাইস্কুল, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিনটি মাদ্রাসা, দুটি ব্যাংক, একটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, তহশিল অফিস, পোস্ট অফিস এবং তিনটি এনজিও অফিস রয়েছে। অপরদিকে, নদীর পূর্ব পাড়ে রয়েছে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তিনটি মাদ্রাসা। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক হাটুরে, শিক্ষার্থী, অফিস কর্মচারী ও পর্যটককে এই নদী পারাপারে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

ঝিনাই নদীর ওপর নির্মিত পিসি গার্ডার সেতুটিতে নেই সংযোগ সড়ক। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

টাঙ্গাইল ও জামালপুর জেলার পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমিতির নেতৃবৃন্দ জানান, ঝিনাই নদীর এই সেতুটি দুই জেলার আন্তঃসড়ক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের ঘাটাইল উপজেলার পোড়াবাড়ী থেকে গোপালপুর হয়ে এই বাইপাস সড়কটি তারাকান্দি-ভূঞাপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পিংনা এলাকায় যুক্ত হয়েছে। আগে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ট্রাক, বাসসহ হাজারো যানবাহন চলাচল করত। কিন্তু সেতু নির্মাণে দীর্ঘ বিলম্ব এবং সামান্য কাজ ফেলে রাখায় টানা দুই বছর ধরে দুই জেলার পণ্য পরিবহন, যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) মধুপুর উপ-বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সোহেল মাহমুদ জানান, পিএমপি (মেজর সেতু-কালভার্ট) প্রকল্পের আওতায় ঝিনাই নদীর ঝাওয়াইল সেতুর নির্মাণকাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে সড়কের উভয় পাশে কিছু খাস জমি জবরদখল থাকায় অ্যাপ্রোচ রোডের কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। এসব জমি পুনরুদ্ধারের জন্য তিন সপ্তাহ আগে গোপালপুর উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। খাস জমি উদ্ধার হলেই দ্রুত অ্যাপ্রোচ রোডসহ অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা হবে।

গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জিল্লুর রহমান জানান, সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই সেতু চালু না থাকলে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত খাস জমি পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঝাওয়ানি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান তালুকদার বলেন, ‘ঝিনাই নদীর সেতুর সংযোগ সড়ক না থাকায় টাঙ্গাইল ও জামালপুর জেলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে রয়েছে। শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা মারাত্মক সমস্যায় পড়ছেন। দ্রুত খাস জমি উদ্ধার করে অ্যাপ্রোচ রোডসহ বাকি কাজ শেষ করে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।’