সীমিত সামর্থ্য, অপ্রতুল জনবল আর অতিরিক্ত রোগীর চাপ সবকিছুর মাঝেও ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা হাসপাতাল প্রতিদিনই সাধারণ মানুষের ভরসাস্থল হয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে বাস্তবে প্রায় দেড় থেকে দুই গুণ রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বেড সংকটের কারণে ফ্লোর ও বারান্দায় রোগী রাখার চিত্রও এখন নিয়মিত।
তবুও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সেবা কার্যক্রম চালু রয়েছে। ইসিজি সুবিধা এবং দুইজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি, আরএমও ডা. মামুনের নিয়মিত উপস্থিতি এসবই এই হাসপাতালের ইতিবাচক দিক হিসেবে ধরা হচ্ছে।
তবে এর আড়ালেই জমে উঠেছে নানা জটিলতা। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল পরিচালনা কমিটি না থাকায় কার্যকর তদারকি ও পরিকল্পিত উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি সক্রিয় ও দায়িত্বশীল স্বাস্থ্য কমিটি থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও গতি ফিরে আসত।
সবচেয়ে বেশি দুর্বলতা চোখে পড়ে জরুরি বিভাগে। যেখানে প্রসূতি মায়ের চিকিৎসা সেবা, দ্রুত সুগার লেভেল পরীক্ষা কিংবা অক্সিজেন স্যাচুরেশন মাপার মতো মৌলিক সুবিধাও অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। জরুরি ওষুধের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, বুকে ব্যথা নিয়ে রোগী এলে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। উল্লেখযোগ্য কারণ হলো, দুপুর দুইটার পর ইসিজি সেবা বন্ধ থাকে, যা রোগীদের জন্য বড় ঝুঁকি।
হাসপাতালের আরএমও ডা. মামুনুর রশিদ রুপালীবাংলাদেশকে জানান, অনুমোদিত ৪৯ জন চিকিৎসকের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৫ জন চিকিৎসক। কনসালট্যান্ট পদ ১১টি থাকলেও কার্যত রয়েছেন হাতে গোনা ২ জন চিকিৎসক।
কার্ডিওলজি বিভাগে ১ জন এবং চক্ষু বিভাগে ১ জন। অ্যানেস্থেসিয়া ও গাইনি বিশেষজ্ঞের অভাবে বছরের পর বছর ধরে প্রসূতি মায়ের সিজার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে, যা নারী রোগীদের জন্য মারাত্মক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, মফস্বলের একটি হাসপাতালে গর্ভবতী মায়ের সিজার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অন্যদিকে, একটি মাত্র অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে পুরো উপজেলার রোগী পরিবহন সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এই হাসপাতালে ওয়ার্ডবয় না থাকায় রোগী সেবায় ব্যাঘাত ঘটছে প্রতিনিয়ত। এমনিতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, তার ওপর একজন রোগীকে দ্রুত কুষ্টিয়া, ফরিদপুর বা ঝিনাইদহে পাঠাতে গেলেই সমস্যায় পড়তে হয়।
যেখানে অন্তত ১০ জন ক্লিনার প্রয়োজন, সেখানে মাত্র ২ জন দিয়ে পুরো হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার কাজ কোনোভাবেই সম্ভব না, যার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
ভুক্তভোগী রোগীদের অভিযোগ, অনেক সময় সাধারণ ওষুধও হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা হয় না। প্রেসক্রিপশন দিয়ে বাইরে থেকে কিনে আনতে বলা হয়, যা দরিদ্র রোগীদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাশের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে।
এক ভুক্তভোগীর ভাষায়, ক্লিনিকে গিয়ে দরদাম করতে চাইলে ম্যানেজার এক পর্যায়ে বলেন, বিলের বড় অংশই ডাক্তারদের দিতে হয়, আমাদের তেমন কিছু থাকে না, এখানে বিল কমানোর বৃথা চেষ্টা করে লাভ নেই ভাই।
সব মিলিয়ে, আন্তরিকতা আর দায়বদ্ধতা থাকলেও অবকাঠামো, জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে কার্যত কঠিন সংকটে পড়েছে শৈলকুপা উপজেলা হাসপাতাল। দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রটি আরও গভীর সংকটে পড়বে এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।


