ঝিনাইদহে জেলাজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে তামাক চাষ। সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যে উঠে এসেছে এমনই ভয়াবহ চিত্র। তামাক কোম্পানিগুলোর নানামুখী প্রলোভনে ঝিনাইদহের ছয়টি উপজেলার মধ্যে চারটিতেই বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে হচ্ছে তামাক চাষ। কৃষকেরা প্রতি বছর যেন নতুন করে তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। তবে সদর ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় ব্যাপক হারে তামাক চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
ইতিহাস বলে, ব্রিটিশরা বাংলা অঞ্চলের বিশাল সমতল ভূমির অতি উর্বরতা ও অপার সম্ভাবনা দেখেই এখানে আস্তানা গেড়েছিল। পরবর্তীতে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন কায়েম হয়, যা ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ অধ্যায়গুলোর একটি। ধীরে ধীরে তারা ধ্বংস করেছিল বাংলার কুটিরশিল্প ও কৃষিখাত। নীল চাষের মাধ্যমে তারা বাংলা অঞ্চলের ভূমির উর্বরতা বিনষ্ট করতে চেয়েছিল। ফসলি জমিতে নীল চাষ করতে কৃষকদের দেওয়া হতো নানা ধরনের প্রণোদনা। দেখানো হতো প্রলোভন। তাতেও কাজ না হলে চালানো হতো নির্মম নির্যাতন। ফলে কৃষকরা অনেকটা বাধ্য হয়েই নীল চাষ করতেন। এতে কমতে থাকে খাদ্যশস্যের চাষ। খাদ্যাভাবে চারদিকে সৃষ্টি হয় হাহাকার। নীল বিদ্রোহ ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে শত শত তাজা প্রাণের বিনিময়ে নীল চাষ বন্ধ হলেও বাংলার চাষিদের কপাল থেকে দুর্ভাগ্যের কালো ছায়া আজও মুছে যায়নি। তা ফিরে এসেছে তামাক হয়ে।
এক সময় জেলায় প্রচুর পরিমাণে মৌসুমি ফসল উৎপাদন হতো। কলা ও পানের পাশাপাশি ধান ও শীতকালীন শাক-সবজি চাষের জন্য এ অঞ্চলের বিশেষ সুখ্যাতি রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যেসব জমিতে সোনার ফসল ফলত, সেসব জমি এখন তামাকের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। সংগত ও যৌক্তিক কারণে লাভজনক হওয়ায় কৃষকেরাও এখন তামাক চাষেই বেশি আগ্রহী। সেই সঙ্গে তামাক কোম্পানিগুলোর প্রলোভন, অনুদান ও সার্বক্ষণিক মনিটরিং তো রয়েছেই। সরকারের পক্ষ থেকে অন্যান্য ফসল চাষে সামান্য কিছু প্রণোদনা বা ভর্তুকি মিললেও, কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে তামাক চাষে তা মিলছে প্রচুর পরিমাণে। বীজ থেকে শুরু করে সার, কীটনাশক, নগদ অর্থ ও সার্বক্ষণিক পরামর্শ মিলছে। ফলে ধান, গম, ছোলা, মসুর, আখ, পেঁয়াজ ও রসুনের চাষাবাদ এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না। এক সময়ের ফসলি জমিগুলোতে এখন কেবল তামাক চাষ করা হচ্ছে।
জমিতে মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, তামাক পাতা ও গাছের নিবিড় সংস্পর্শ এবং রাত জেগে তামাক পাতা জ্বালানোয় রয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। তামাক চাষিদের মধ্যে ক্যানসার, অ্যাজমা, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের সংক্রামক রোগ প্রতিনিয়ত ছড়াচ্ছে। তামাক চাষে কৃষিজমিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক প্রয়োগের ফলে কমে যাচ্ছে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা। তামাক পাতা জ্বালাতে প্রয়োজন হয় জ্বালানি কাঠের। সংগত কারণেই প্রতি বছর বন উজাড় হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনে মূখ্য ভূমিকা পালন করছে।
ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে তামাক চাষ হয়েছিল ১৯৩ হেক্টর জমিতে। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে চাষ হয়েছে ২২৯ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ৫৫২ মেট্রিক টন তামাক। এ বছর ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে তামাক চাষ হয়েছে ২২২ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২১ হেক্টর, মহেশপুরে ১০ হেক্টর, শৈলকুপায় ১৫ হেক্টর এবং হরিণাকুণ্ডুতে সবচেয়ে বেশি ১৭৬ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। এসব জমিতে একসময় ধানসহ অন্যান্য ফসলের চাষ হতো।
বরকত নামে এক তামাক চাষি জানান, এক বিঘা জমিতে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি তামাক উৎপাদন হয়। গত বছর কোম্পানি ২২৬ টাকা দরে প্রতি কেজি তামাক কিনেছে। এ বছরও দাম ভালো। দিন শেষে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও লাভজনক হওয়ায় তামাক চাষ ভালো।
সীমান্ত নামে অপর এক তামাক চাষি জানান, নিজের জমি না থাকলেও ৭ থেকে ৮ বিঘা জমি লিজ নিয়ে তামাক চাষ করেছি। তামাক চাষে পরিশ্রম অনেক, ঝুঁকিও আছে। কিন্তু দিন শেষে মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জমির মালিক জানান, সারা বছরের জন্য জমি লিজ দিলে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। সেখানে তামাক চাষে ৪ থেকে ৫ মাসের জন্য জমি লিজ দিয়ে বিঘাপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। বাকি সময় নিজে চাষ করি। তামাক চাষে জমি দিয়ে অল্প সময়েই অনেক বেশি টাকা পাওয়া যায়।
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান দৈনিক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষকদের সবসময়ই তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করা হয়। তামাকের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে কৃষকদের অবহিত করা এবং বিকল্প চাষ হিসেবে ক্যাপসিকাম, ড্রাগন, রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপিসহ উচ্চমূল্যের সবজি ও ফল চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তামাকের ভয়াবহতা থেকে কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।


