ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

৯১ বছরেও মেলেনি কোনো ভাতার কার্ড লতিফুনের

কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ০১:২৩ পিএম
লতিফুন নেসা। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

বয়সের ভারে ন্যুব্জ, চলাফেরার একমাত্র ভরসা একটি লাঠি। জীবনের ৯১ বছর পার করেও সরকারি কোনো ভাতার সুবিধা পাননি ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার দোড়া ইউনিয়নের রুদ্রপুর বিশ্বাসপাড়ার বাসিন্দা লতিফুন নেসা। স্বামী হারিয়েছেন প্রায় তিন দশক আগে। বর্তমানে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও অসুস্থ। অথচ বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা এবং প্রতিবন্ধী সহায়তাসহ একাধিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আসার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তার ভাগ্যে জোটেনি একটি ভাতার কার্ডও। বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লতিফুন নেসার স্বামী আবুল বিশ্বাস প্রায় ৩০ বছর আগে ৬০ বছর বয়সে মারা যান। এরপর থেকেই তিনি ছেলেদের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করছেন। সংসার জীবনে তার দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়ে রয়েছে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে অনেক আগেই। বর্তমানে দুই ছেলের সংসারের ওপর নির্ভর করেই চলছে তার জীবন।

বড় ছেলে কাশেম বিশ্বাস (৭০) বয়সজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে দুর্বল। ছোট ছেলে আব্দুল খালেক বিশ্বাস (৬৫) একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং তিনি প্রতিবন্ধী ভাতা পান। নিজেদের সংসারের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি বৃদ্ধা মায়ের দেখভাল করতে গিয়ে দুই ছেলেই হিমশিম খাচ্ছেন।

সম্প্রতি পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার পর থেকে লতিফুন নেসার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। বর্তমানে তিনি লাঠির সাহায্যে চলাফেরা করেন। পরিবারের সদস্যরা কোনোভাবে তার খাবারের ব্যবস্থা করতে পারলেও চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যয় বহন করা তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

লতিফুন নেসা আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভাতার টাকা পেলে নিজের ইচ্ছেমতো কিছু কিনে খেতে পারতাম। নাতি-নাতনিদেরও কিছু দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু টাকা না থাকলে কীভাবে দেব? তাই আমার ভাতার খুব দরকার।’

তার পুত্রবধূ শেফালী খাতুন বলেন, ‘আমরা কোনোভাবে সংসার চালিয়ে শাশুড়িকে দুই বেলা খাবার দিতে পারি। কিন্তু তার চিকিৎসা, ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ বহন করা খুব কঠিন হয়ে যায়। সরকারি ভাতা পেলে তিনি কিছুটা স্বস্তি পেতেন।’

প্রতিবেশী আব্দুল মজিদ জানান, দীর্ঘদিন ধরে ভাতার কার্ডের আশায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে ঘুরেছেন লতিফুন নেসা। কয়েকবার জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবিও নেওয়া হয়েছে, কিন্তু আজও কোনো ভাতার কার্ড পাননি। তিনি বলেন, ‘একজন ৯১ বছর বয়সি বিধবা নারী বয়স্ক ও বিধবা ভাতার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও কেন এখনো সুবিধা পাননি, সেটি বড় প্রশ্ন।’

এ বিষয়ে দোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল বলেন, ‘আগের অপেক্ষমাণ তালিকায় তার নাম ছিল না। প্রায় ১৫ দিন আগে যে নতুন তালিকা করা হয়েছে, সেখানে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইউনিয়নে কয়েকশ’ আবেদনকারী থাকায় বিষয়টি আগে জানা সম্ভব হয়নি। এখন বিষয়টি নজরে এসেছে, সুযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপা রানী সরকার বলেন, ‘গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। তিনি ইতোমধ্যে অনলাইনে ভাতার জন্য নিবন্ধন করেছেন বলে জেনেছি। তার নিবন্ধনের কাগজপত্র আমার কাছে পাঠালে আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখব। সুযোগ থাকলে তাকে সরকারি ভাতার আওতায় আনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।’

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে লতিফুন নেসার একটাই প্রত্যাশা—সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এসে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে বাকি জীবন কাটানো। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের আশ্বাস কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়।