ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

কারিগর সংকটে দর্জিদের রাত জাগা, তবুও বাড়ছে না লাভ

আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মার্চ ১৩, ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার দর্জি দোকানগুলোতে বেড়েছে কাজের চাপ। নতুন পোশাক তৈরির অর্ডার বাড়লেও দক্ষ কারিগরের সংকট এবং সেলাই উপকরণের দাম বৃদ্ধির কারণে চাপে পড়েছেন দর্জিরা।

ফলে অনেক দর্জিকে রাত জেগে কাজ করেও সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঈদের আর মাত্র সাত দিন বাকি থাকায় অনেক দর্জি নতুন অর্ডার নিতে চাইছেন না।

উপজেলার আক্কেলপুর পৌর বাজার, তিলকপুর বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেলাই মেশিনের শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে টেইলার্স দোকানগুলো। ঈদের আগে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্ডার শেষ করতে গিয়ে অনেক দর্জি প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পুরো আক্কেলপুর সদরে প্রায় ৩৫টি টেইলার্সের দোকান রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ দোকানেই বর্তমানে দক্ষ কারিগরের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক দোকানে অর্ডারের তুলনায় কর্মী কম থাকায় কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

স্থানীয় দর্জিরা জানান, কয়েক বছর আগেও একটি দোকানে চার থেকে পাঁচজন কারিগর কাজ করতেন। কিন্তু বর্তমানে অনেক দক্ষ কারিগর অটোরিকশা চালানো, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় কর্মী সংকট তৈরি হয়েছে।

ফলে অনেক দোকানে এখন একজন বা দুজন কারিগর দিয়েই পুরো কাজ সামলাতে হচ্ছে। আবার কিছু দোকানে আলাদা কোনো কারিগর নেই দোকান মালিক নিজেই সব কাজ করছেন।

আক্কেলপুর বাজারের দর্জি মো. পবন মণ্ডল বলেন, ঈদের আগে কাজের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। আগে দোকানে কয়েকজন কারিগর ছিল, এখন কারিগর পাওয়া যায় না। তাই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিজেই কাজ করতে হচ্ছে। বয়সও হয়েছে, একাই সব সামলাতে হয়। তাই আর নতুন অর্ডার নিচ্ছি না।

দর্জিরা জানান, শুধু কাজের চাপ নয়, পোশাক তৈরির উপকরণের দামও বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে জর্জেট কাপড়ের দাম প্রতি মিটার প্রায় ৩০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে, যা কাপড়ের মান ও ডিজাইনের ওপর নির্ভর করে।

স্থানীয় টেইলার্স দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জর্জেট কাপড়ের থ্রি-পিস বা কামিজ সেলাই করতে ৪০০–৪৫০ টাকা, সুতির কাপড়ের পোশাক সেলাই করতে ১৫০-২০০ টাকা, পাঞ্জাবি সেলাই করতে ২৫০-৩৫০ টাকা এবং শার্ট বা প্যান্ট সেলাই করতে ৩০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

দর্জিরা বলেন, একটি পোশাক তৈরিতে শুধু কাপড় নয় সুতা, কাটিং ফিতা, বোতাম, চেইনসহ বিভিন্ন উপকরণ লাগে। এসব উপকরণের দামও আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় একটি পোশাক তৈরি করতে দর্জিদের মোট খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক দর্জি কারিগর পিস রেট অনুযায়ী কাজ করেন। অর্থাৎ একটি পাঞ্জাবি বা শার্ট সেলাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট মজুরি পান। ফলে অর্ডার বেশি থাকলেও সেই অনুযায়ী আয় বাড়ে না।

এদিকে ঈদের নতুন পোশাক তৈরির জন্য ক্রেতাদের ভিড়ও বাড়ছে দর্জি দোকানগুলোতে। বিশেষ করে পাঞ্জাবি, শার্ট-প্যান্ট, থ্রি-পিস ও শিশুদের পোশাক তৈরির অর্ডার বেশি পাওয়া যাচ্ছে।

স্থানীয় ক্রেতা মো. মতিউর রহমান বলেন, মেয়ের জন্য থ্রি-পিস কিনে সেলাই করাতে এসেছি, কিন্তু দোকানদার অর্ডার নিতে চাচ্ছেন না। প্রতি বছরই একই অবস্থা। নতুন প্রজন্ম সেলাই শেখার দিকে না আসলে ভবিষ্যতে কারিগর সংকট আরও বাড়বে।

দর্জিরা জানান, ঈদের সময় কাজের চাপ অনেক বাড়লেও আগের মতো লাভ করা সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে কারিগর সংকট, অন্যদিকে কাপড় ও সেলাই উপকরণের দাম বৃদ্ধি সব মিলিয়ে ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে অনেক সময় অতিরিক্ত অর্ডারও ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।

জয়পুরহাট বিসিক শিল্প নগরীর উপ-পরিচালক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, দর্জি ও কারিগরদের দক্ষতা বাড়াতে ট্রেড ট্রেনিং সেন্টার টিটিসিতে সরকারি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এতে স্থানীয় কারিগররা আধুনিক সেলাই কলাকৌশল ও কাপড় তৈরির নতুন প্রযুক্তি শিখতে পারবেন। এর মাধ্যমে তাদের আয়ের সুযোগ বাড়বে এবং ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের সময় অর্ডার সময়মতো শেষ করতেও সহায়ক হবে।