× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রূপালী প্রতিবেদক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম

এক মামলাবাজ সন্তানের চাপে দিশাহারা পুরো পরিবার!

রূপালী প্রতিবেদক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। দুই ভাই এক বোন আর বাবা-মাকে নিয়েই ছিল তাদের একটি সুন্দর পরিবার। তিনি পরিবারের বড় সন্তান। বাবার মৃত্যুর পর পুরো পরিবারকে আগলে রাখার দায়িত্ব ছিল তারই। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর সম্পত্তি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে মরিয়া হয়ে উঠেন তিনি। নিজ পরিবারের সদস্যদের নামে করেছেন, একের পর এক মিথ্যা মামলা।

আব্দুল্লাহ আল মাসুদের এমন কর্মকাণ্ডে পুরো পরিবার এখন দিশাহারা। শুধু তাই নয়, নিজের বোন এবং বোন জামাইকেও নানাভাবে হয়রানি করছেন মাসুদ। নিজের ছেলের বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে জালিয়াতির মামলা করেছেন মা হোসনেয়ারা বেগম।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালে। আব্দুল্লাহ আল মাসুদ যখন খুলনায় চলে যান। ওই বছর তার বাবা এম. এ. কুদ্দুস এবং আপন ছোট ভাই আব্দুল্লাহ একটি বিল্ডিংয়ের নির্মাণকাজে ব্যস্ত ছিলেন। তৎকালীন বেসিক ব্যাংক খুলনা শাখা থেকে তার বাবা এবং ছোট ভাই বিল্ডিংয়ের কাজের জন্য একটি ঋণ গ্রহণ করেন। বাড়ির নির্মাণকাজের সময় আলাউদ্দিন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে মাসিক পাঁচ লাখ টাকা ভাড়া এবং ৭৫ লাখ টাকা জামানতে ব্যবসায়িক চুক্তি করেন মাসুদের বাবা এম. এ. কুদ্দুস। ওই সময় মাসুদ আলাউদ্দিনকে হটিয়ে নিজে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি হোটেল হিসেবে পরিচালনা করার জন্য ফন্দি করেন। মাসুদ প্রতারণা করে আলাউদ্দিনের সমস্ত ফার্নিচার দিয়ে হোটেল ব্যবসা শুরু করেন। এই সময় সহযোগী হিসেবে তার চাচাতো ভাই মো. পিয়াস হোসেন হোটেলটিতে কাজ করতেন। পরবর্তীতে ব্যবসায়ী আলাউদ্দিনের ফার্নিচার আত্মাসাতের ঘটনায় একটি মামলা হয়।

শুরুর দিকে হোটেলের বেচাকেনা একেবারে কম ছিল। দৈনন্দিন ব্যবসার টাকা মাসুদ তার মায়ের কাছে জমা করতেন। একটা পর্যায়ে তার বাবা এম. এ. কুদ্দুস শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে মাসুদ তার বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার শুরু করেন। একটা সময় তার বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হন। ওই সময় তার ভাই ও বোন দেশের বাইরে ছিলেন।

অভিযোগ উঠেছে, মাসুদ তার বাবাকে উন্নত চিকিৎসা না করানোয় ২০২৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। আব্দুল্লাহ আল মাসুদ তার বাবা এম. এ. কুদ্দুসের মৃত্যুর পর সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য স্ট্যাম্প এবং স্বাক্ষর জালিয়াতি করেন। এরপর একটি  চুক্তিনামা পরিবারকে দেখিয়ে সম্পত্তি এককভাবে ভোগ দখলের দাবি করেন।

এ ঘটনায় মাসুদের মা ২০২৪ সালে একটি ক্রিমিনাল মামলা দায়ের করেন। মামলা তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হওয়ায় আদালত মাসুদকে জেল হাজতে পাঠান। মাসুদ উচ্চ আদালত থেকে মায়ের সঙ্গে সমস্যা সমাধানের শর্ত সাপেক্ষে ছয় মাসের জামিন নেন। জামিনে বের হয়েই মাসুদ তার বর্তমান স্ত্রী ফারাহ আজাদ কান্তার সঙ্গে যোগসাজশে আপন ছোট ভাই আব্দুল্লাহর তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী জান্নাত ই মিতুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মিতুকে ভয় দেখিয়ে এবং কু-প্ররোচনা দিয়ে মাসুদ নিজের আপন বোন জামাইকে আসামি করে একটি মিথ্যা অপহরণ মামলা দায়ের করেন। মাসুদ নিজ ছোট ভাইয়ের সন্তানদের জিম্মি করে বোন জামাই এবং আপন ছোট ভাই আব্দুল্লাহকে আসামি করে মিতুকে দিয়ে একটি মিথ্যা অপহৃত মামলাও দায়ের করান। তদন্তে বিষয়টি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পর অভিযোগটি খারিজ করে দেন আদালত।

মামলা সূত্রে জানা যায়, মাসুদ সম্পত্তি দীর্ঘদিন সুকৌশলে ভোগ দখলের পাঁয়তারায় একটি সিভিল বাঁটোয়ারা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু মাসুদের মা এবং ভাই বোন আদালতে রিসিভার নিয়োগের দরখাস্ত করলে আদালত রিসিভার নিয়োগের আদেশ দেন। কোর্টের আদেশ অনুযায়ী খুলনা মেট্রোপিলটন পুলিশ সম্পত্তিটি নিজেদের হেফাজতে নেয়। এরপর মাসুদ পরিবারের সবার বিরুদ্ধে, পুলিশ কমিশনার এবং সোনাডাঙ্গা থানার ওসি সবাইকে বিবাদী করে একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেন।

পরিবারের অভিযোগ, আব্দুল্লাহ আল মাসুদ তার বোন এবং বোন জামাইয়ের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ছবি নিয়ে তা ব্যবহার করে নামে-বেনামে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে অভিযোগ করছেন মিতুর নাম ব্যবহার করে। এমনকি বিভিন্ন ভুঁইফোড় ফেসবুক পেজ আর ইউটিউব চ্যানেলে ভুয়া খবর প্রচার করে তার বোন এবং বোনের জামাইয়ের নামে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছেন এবং পরিবারের সকলের চরিত্র হননের চেষ্টা করছেন।

এ বিষয়ে জান্নাত ই মিতু বলেন, ‘আব্দুল্লাহ আল মাসুদ একজন অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি। সে আমাকে ভয়ভীতি দিয়ে এবং আমাকে ব্যবহার করে সংবাদ সম্মেলন এবং মামলা দায়ের করিয়েছে। আমার বাসায় লোকজন পাঠিয়ে মামলার কাগজে স্বাক্ষর দিতে বলেন। আমার সন্তানদের নিজে ঢাকায় নিয়ে লুকিয়ে রেখে আব্দুল্লাহ আল মাসুদ তার নিজ বোন, ভাই ও বোন জামাইয়ের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করতে আমাকে বাধ্য করেন। আমার সংসার ভাঙার কারণও আব্দুল্লাহ আল মাসুদ।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাসুদের বোন এবং তার স্বামী বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার জন্য আব্দুল্লাহ আল মাসুদ আমার নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করছেন, যা একটি অপরাধ। সকলের উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই যে আমি কোনো অভিযোগ কারো বিরুদ্ধে করিনি।’

পুলিশ কমিশনার ও সোনাডাঙ্গা থানার ওসির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার জাহিদুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশে রিসিভার হিসেবে আমরা পুষ্প বিলাস সম্পত্তিটি নিজেদের তত্ত্বাবধানে নিয়েছি। প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান রাখতে একটি কমিটি করে পরিচালনা করছি।

তিনি আরও বলেন, কেউ যদি মনে করেন তবে তিনি বিচারের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। সে অনুযায়ী আব্দুল্লাহ আল মাসুদ পুলিশ কমিশনার ও সোনাডাঙ্গা থানার ওসির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখবে সংশ্লিষ্টরা।

মামলার কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আব্দুল্লাহ আল মাসুদের জালিয়াতি করা স্ট্যাম্পটি ২০২০ সালের মার্চ মাসে ক্রয় করা হয়েছে। কিন্তু স্ট্যাম্পটি স্বাক্ষরিত হয়েছে ২০২০ সালের পহেলা জানুয়ারি। এ ঘটনায় আব্দুল্লাহ আল মাসুদের মা হোসনেয়ারা বেগম একটি জালিয়াতি মামলা করেন। আদালত তদন্ত এবং ফরেন্সিং করার জন্য স্ট্যাম্পটি সিআইডিতে পাঠান। পরে স্বাক্ষরগুলো সব জাল বলে প্রমাণিত হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে আব্দুল্লাহ আল মাসুদ শর্ত সাপেক্ষে জামিনে বের হন।

মাসুদ তার আপন বোন জামাইকে এক নম্বর আসামি করে জান্নাত ই মিতুকে বাদী হিসেবে ব্যবহার করে ২০২৪ সালে একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন, যার মামলা নং ১৫৬১/২৪। তবে মামলার এজাহারে যে সময় উল্লেখ করা ছিল ওই সময় তার ভগ্নিপতি একটি পাবলিক প্রোগ্রামে উপস্থিত থাকায় মামলাটি সিআইডির তদন্তে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। এর আগে ২০২২ সালে জান্নাত ই মিতু খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে আব্দুল্লাহ আল মাসুদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।

অপরদিকে, দারোয়ান ডালিমকে মারপিট ও মালামাল লুটের অভিযোগে খুলনা থানায় জিআর মামলা হয় ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর। পুলিশ এই মামলায় চার্জশিট প্রদান করেছে। অন্যদিকে আব্দুল্লাহ আল মাসুদ ও তার সহযোগীদের দায়ের করা মামলা সিআর মামলা নং ১৫২৭/২০২৪ ও ১১২৭/২০২৪ এবং বোন ও মায়ের বিরুদ্ধে মাসুদের স্ত্রীর দায়ের করা মামলা পিবিআইয়ের তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

সূত্র জানায়, এম. এ. কুদ্দুসের সম্পত্তি হোটেল পুষ্প বিলাসের কাগজপত্র জাল করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে হোটেল টাইগার গার্ডেন লিজ নেওয়ার চেষ্টা করেন আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানার পর আব্দুল্লাহ আল মাসুদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়নি।

আব্দুল্লাহ আল মাসুদের মা হোসনেয়ারা বেগম বলেন, চাকরি হারিয়ে মাসুদ খুলনায় চলে আসে। এরপর থেকে ভাই বোনদের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ শুরু করে। এমনকি কাগজপত্র জালিয়াতি আর আমার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে। আমি আমার সন্তানদের কথা চিন্তা করে এক পর্যায়ে জালিয়াতি মামলা করি। মাসুদ সেই মামলায় দুই মাস ২০ দিন সাজা ভোগ করে। মাসুদকে অনেক বুঝিয়েছি। কিন্তু মাসুদ কারো কথা শোনে না। ভাই-বোন এমনকি আমার মেয়ের জামাইয়ের বিরুদ্ধেও মিথ্যা মামলা করেছে। সব মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মাসুদের কারণে সকলের মাঝে এখন বিভেদ তৈরি হয়েছে। সে সঠিক পথে ফিরে আসুক তাই চাই।

আব্দুল্লাহ আল মাসুদের ছোট ভাই আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমার বোন এবং দুলাভাই দুইজন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাদের হেয় প্রতিপন্ন করে আব্দুল্লাহ আল মাসুদ সম্পত্তি আত্মসাৎ করতে চাচ্ছে। আমরা জালিয়াতিতে বাধা দিলে সকলের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করেন, যা আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।’

আদালতে মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার কারণে আক্রোশমূলকভাবে তিনি বিভিন্ন দপ্তরে আমাদের বোন এবং দুলাভাইয়ের নামে মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছেন। ভুঁইফোড় ফেসবুক পেজ থেকে দুর্নীতির তকমা দিয়ে ভুয়া প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। আমাদের পরিবারের সবাই মানসিকভাবে খুবই ভেঙে পড়েছে। আমি এখন সকল অন্যায়ের ন্যায়বিচার চাই।

খুলনার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পেশকার শাহীন বলেন, ১৫৬১/২৪ মামলাটি ২০৩ ধারা মোতাবেক খারিজ করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পুলিশের তদন্তে প্রমাণিত না হওয়ায় মামলাটি খারিজ হয়েছে।

এদিকে আব্দুল্লাহ আল মাসুদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার বিষয়ে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে। এখানকার জজ আইন লঙ্ঘন করে পুষ্প বিলাস হোটেলে রিসিভার নিয়োগ দিয়েছে। আমার মা এবং বোন কেএমপি পুলিশ কমিশনারকে রিসিভার নিয়োগের আবেদন করেন।

জালিয়াতি মামলার বিষয়ে বলেন, আমার ভাই ও বোন আমার মাকে দিয়ে এ মামলা করিয়েছে। আমি কোনো জালিয়াতি করিনি।

বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগের বিষয়ে বলেন, আমি নিজে অভিযোগকারী হয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি। তাদের লিখিত দিয়েছি। আমি দুদককে জানিয়েছি। দুদকেও আমি লিখিত দিয়েছি। এ ছাড়া জান্নাত ই মিতু বাসা থেকে চলে যাওয়ার পর বাসার সবার নামে মামলা করেছিল।

তিনি আরও বলেন, আমি জান্নাত ই মিতুর কাছ থেকে জেনেছি তার বাচ্চা নিখোঁজ। আমি তখন সব জায়গায় তাকে খোঁজ নিতে বলি। প্রশাসনকে জানাতে বলি। এরপর সে মামলা করে। সে তিন বাচ্চার মা, তাকে জোর করে মামলা করানোর প্রশ্নই আসে না। মিতু স্বেচ্ছায় মামলা করেছেন বলেও দাবি আব্দুল্লাহ আল মাসুদের।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!