ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

তাড়াইলে নিষিদ্ধ পলিথিনের দৌরাত্ম্য

আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই, হুমকিতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

মুকুট রঞ্জন দাস, তাড়াইল (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২, ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন, মজুদ, বাজারজাত ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় সেই আইন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। উপজেলার প্রতিটি হাট-বাজার ও দোকানে প্রকাশ্যেই চলছে নিষিদ্ধ পলিথিনের বেচাকেনা ও ব্যবহার। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি না থাকায় জনমনে গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে তাড়াইল সদর বাজার, শিমুলাটি, শামুকজানি, পুরুড়া চৌরাস্তা, জাওয়ার, তালজাঙ্গা, দামিহা, দিগদাইড়, কাজলা ও ধলা ইউনিয়নের বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা যায়, মুদি দোকান, মাছ-মাংসের দোকান, কাঁচাবাজার, মিষ্টির দোকান, সবজি বাজার এমনকি ওষুধের দোকানেও অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ। ক্রেতাদের হাতে পণ্য তুলে দিতে দোকানিরা নির্বিঘ্নেই এসব ব্যাগ ব্যবহার করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ‘সবাই ব্যবহার করছে। কোনো অভিযান না থাকলে আমরা একা বন্ধ করে টিকে থাকতে পারব না। তা ছাড়া পলিথিন সহজেই পাওয়া যায় এবং দামেও সাশ্রয়ী।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পার্শ্ববর্তী উপজেলা করিমগঞ্জ, ভৈরব ও কিশোরগঞ্জ জেলা শহর থেকে নিয়মিত ট্রাক ও পিকআপযোগে পলিথিন ঢুকছে তাড়াইলে। স্থানীয় পাইকারদের মাধ্যমে এসব পণ্য খুচরা ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এত বড় একটি সরবরাহ চক্র সক্রিয় থাকলেও কোথাও জব্দ, মামলা কিংবা বড় ধরনের অভিযানের কোনো নজির নেই।

পরিবেশবিদদের মতে, পলিথিন শত শত বছরেও মাটিতে পচে না। এর ফলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। নদী-খাল ভরাট হয়ে জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন প্রাণী ভুল করে পলিথিন খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা মারা যায়।

তাড়াইল সদর বাজারের মোবাইল ব্যবসায়ী মাহাবুবুর রহমান বলেন, ড্রেনের পানি নামতে পারে না। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাট ডুবে যায়। বাজারে পায়ে হেঁটে চলাচল করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। এর জন্য সবাই পলিথিনকেই দায়ী করে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অতীশ দাস রাজীব জানান, গরম খাবার পলিথিনে রাখলে ক্ষতিকর রাসায়নিক খাবারের সঙ্গে মিশে যায়, যা মানবদেহে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পলিথিন পোড়ালে কার্বন মনোক্সাইড ও ডাইঅক্সিনের মতো বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়, যা শ্বাসযন্ত্রের রোগ, ত্বকের সমস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। পাশাপাশি পরিবেশ দূষণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনেও পলিথিন বড় ভূমিকা রাখছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবহারে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও তাড়াইলে তার বাস্তব প্রয়োগ চোখে পড়ছে না। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বাজার মনিটরিং না থাকায় ব্যবসায়ীরা আইন অমান্য করতে আরও উৎসাহিত হচ্ছেন।

পরিবেশবাদী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এখনই কঠোর অভিযান চালিয়ে সরবরাহ চক্র ভেঙে দেওয়া এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যাগ ব্যবহারে প্রণোদনা না দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

সাংবাদিক রবীন্দ্র সরকার বলেন, শুধুমাত্র নিষিদ্ধ পলিথিনের কারণেই তাড়াইল বাজার আজ নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন। যেদিকেই তাকানো যায়, সড়কে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে পলিথিন।

সচেতন মহলের মতে, নিষিদ্ধ পলিথিনের অবাধ দাপট তাড়াইলের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক অদৃশ্য কিন্তু ভয়াবহ বিপদের নাম। আইন যদি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এই ক্ষতির দায় এড়াতে পারবে না কেউই।