ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

৩ বছর ধরে পরিত্যক্ত

কোনো কাজেই আসেনি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স!

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: এপ্রিল ২১, ২০২৬, ০২:০৩ পিএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

লক্ষ্মীপুর জেলার উপকূলীয় এলাকা রামগতির বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চরআব্দুল্লাহ। এই দ্বীপটি চরাঞ্চল হওয়ায় এখানকার মানুষের যাতায়াত পুরোপুরি নৌপথ নির্ভর। চরের অসুস্থ মানুষের জন্য জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ২০২২ সালে একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স দেয় সরকার।

অথচ সেটি মানুষের কোনো কাজেই আসেনি। প্রায় তিন বছর ধরে এটি একটি খালে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় অ্যাম্বুলেন্সটির কাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে, এমনকি এর ইঞ্জিনও চুরি হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি পাওয়ার পর প্রথমে এটি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ব্যবহার করতে থাকেন। পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তৎকালীন ইউএনও অ্যাম্বুলেন্সটি তাদের কাছ থেকে নিয়ে স্থানীয় সেন্টার খালে ফেলে রাখেন। এরপর থেকে প্রায় তিন বছর ধরে এটি সেখানেই পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

স্থানীয়রা বলেন, মানুষের জীবনরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ অ্যাম্বুলেন্সটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাবে শুরু থেকেই অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। এতে চরের কয়েক হাজার মানুষ জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রামগতি উপজেলার চরআব্দুল্লাহ ও চরগজারিয়া ইউনিয়নসহ চারটি চরে কয়েক হাজার মানুষের বসবাস, যাদের যোগাযোগব্যবস্থা নৌপথনির্ভর। বর্ষা মৌসুমে এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ওই সময় গুরুতর অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে নৌকা বা ট্রলারের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হয় এবং সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় নদীপথে রোগী পরিবহনের জন্য সরকার তিন লাখ টাকা মূল্যের একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেয়।

‘স্বপ্নযাত্রা’ প্রকল্পের আওতায় অ্যাম্বুলেন্সটি বরাদ্দ দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত রোগী এনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু শুরু থেকেই এটি অকার্যকর অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে অ্যাম্বুলেন্সটির ইঞ্জিনসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে।

চরগজারিয়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স চালু থাকলে নদীপথে দুর্ঘটনা কিংবা হঠাৎ অসুস্থতায় মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যেত। কিন্তু বাস্তবে কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম, আবদুল কাইয়ুম ও রায়হান চৌধুরী বলেন, আমরা মেঘনা নদীর ওপারে একটি চরে বসবাস করি। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বৃষ্টির সময় হঠাৎ অসুস্থ হলে ৩-৪ হাজার টাকা খরচ করে নৌকা ভাড়া করতে হয়। অ্যাম্বুলেন্সটি চালু থাকলে গরিব মানুষের অনেক উপকার হতো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান জানান, প্রাক্তন জেলা প্রশাসক ভালো উদ্যোগ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি চালু করেছিলেন। তবে এটি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চালকদের স্থায়ী বেতন না থাকায় এবং ভাড়া না পাওয়ায় পরবর্তীতে চালকও পাওয়া যায়নি। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে নিয়মিত খরচ বহন করাও সম্ভব হয়নি।

চরআব্দুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মঞ্জু বলেন, চারপাশে নদীবেষ্টিত এই ইউনিয়নসহ আশপাশের চরের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের জন্য অ্যাম্বুলেন্সটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু শুরু থেকেই এটি কার্যকর করা যায়নি।

রাজনৈতিক সভায় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের বিষয়ে চরকাদিরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, ‘স্বপ্নযাত্রা’ অ্যাম্বুলেন্সটি কেউ ভাড়ায় নিত না। পড়ে থাকত, কিন্তু চালককে বেতন দিতে হতো। তাই ভাড়ায় ব্যবহার করেছি।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামনাশীষ মজুমদার বলেন, অনেক আগে ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি সরবরাহ করা হয়েছে। এটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, সম্ভবত উপজেলা পরিষদের অধীনে রয়েছে। বর্তমানে এটি শুধু নামেই আছে, কাজে নেই।

রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াসমিন নিপা বলেন, ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এতদিন ধরে এটি অকার্যকর কেন, তা খতিয়ে দেখা হবে। দ্রুতই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।