ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬

১৮ বছরের সিফাতের কাঁধে মা ও তিন বোনের লাশ

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২৬, ০২:১৭ এএম
সিফাতের পাশে মা ও তিন বোন। ছবি : সংগৃহীত

১৮ বছরের জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। ২০১৯ সালে ১২ বছর বয়সে বাবা কামাল হোসেনকে হারিয়েছে। ছয় বছরের ব্যবধানে এখন মা ও তিন বোনকে হারালো। বাবাকে হারানোর পর স্থানীয় লোকজন এবং আত্মীয়-স্বজনদের সহযোগিতায় চলতো সংসার এবং ভাইবোনদের লেখাপড়া।

লেখাপড়ার পাশাপাশি সেও সংসারের হাল ধরে। তিন বোনসহ পাঁচজনের সংসারের ভার কাঁধে তুলে নেয় সে। রায়পুর শহরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানের কর্মচারী হিসেবে কাজ নেয়। কোনোভাবে চলতো তাদের সংসার।

সিফাতের পাঁচজনের পরিবারের চারজনেই এখন না ফেরার দেশে। বাবা-মা ও বোনদের হারিয়ে পৃথিবীতে আপন বলতে আর যেন কেউ রইলো না তার। একা রয়ে গেল সে। চার লাশের ভার এখন তার কাঁধে। ছোট্ট সিফাত এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ছয় বছর আগে একটি দুর্ঘটনা তার বাবা কামাল হোসেনকে কেঁড়ে নেয়। এবার একজন ঘাতকই নিয়ে গেছে তার পরিবারের চার সদস্যকে।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে রায়পুর শহরের ধানহাটা সংলগ্ন ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে থাকা একটি ভাড়া বাসায় তার মা শাহিনুর আক্তার (৩৮), বড় বোন সায়মা আক্তার (২০), মেঝো বোন নাফিসা আক্তার ইকরা (১৬) ও ছোট বোন সিফা আক্তারকে (৯) খুন করে ঘাতক।

পরে স্থানীয় লোকজনের গণপিটুনিতে মারা যায় সন্দেহভাজন অভিযুক্ত ঘাতক অন্তর মজুমদার (২৮)। তাদের পূর্ব পরিচিত ছিল অন্তর। তবে ঘটনাটি কেন ঘটেছে, সে বিষয়টি এখনো আজানা রয়ে গেছে। সন্দেহভাজন ঘাতকের মৃত্যু হওয়ায় পুলিশ এখনো রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। আর এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি সিফাতও।

ঘটনার পর শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ায় গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেনি সিফাত। তবে সে জানিয়েছে, ঘটনার আগেই সে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর সেই ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারে।

সিফাতের বড় বোন সায়মা আক্তার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ২০২২-২০২৩ সেশনের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিল। জানা গেছে, ২০২৪ সালে ওই কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে কিনা- সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি।

সিফাতের মেঝো বোন নাফিসা আক্তার ইকরা রায়পুর মার্চেন্ট একাডেমী থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। ফল প্রত্যাশী ছিল সে। আর ছোট বোন শিফা আক্তার রায়পুর মার্চেন্ট একাডেমী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিল।

সিফাত রায়পুর সরকারি কলেজে এইচএসসিতে অধ্যয়নরত। পড়ালেখার পাশাপাশি রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের রড-সিমেন্টের দোকানে চাকরি করতো সে। দীর্ঘদিন ধরেই সে এখানে কর্মরত।

স্থানীয়রা জানায়, সিফাত ও তার তিন বোন অত্যন্ত মেধাবী ছিল। তাই তার বাবার মৃত্যুর পরে অভাব অনটনের মাঝেও চার ভাই বোন লেখাপড়া অব্যাহত রেখেছে।

সিফাতের বাবা কামাল হোসেনের (৫০) বাড়ি ছিল কুমিল্লার হোমনা থানাধীন লটিয়া গ্রামে। তিনি ফেরি করে গ্রামে গ্রামে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করতেন। ২০১৯ সালের ২৯ মে রায়পুর উপজেলার কেরোয়া ইউনিয়নের কয়াল বাড়ির সামনে ঘাঁড়ে করে হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে যাওয়ার সময় বিদুতের একটি ছেঁড়া তারে জড়িয়ে মারা যান। তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর রায়পুরের ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে ধানহাটা এলাকায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী সন্তান সেখানেই থেকে যায়। ওই স্থানেই সিফাত ছাড়া পরিবারের বাকি চার সদস্যের জীবনের সমাপ্তি ঘটে। 

ঘটনার পর এখন বাকরুদ্ধ সিফাত। প্রথমে ঘটনা শুনে বাসায় গিয়ে বুক চাপড়ে সে কান্নাকাটি করতে থাকে। তার কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ধারণকৃত একটি ভিডিওতে তার গগনবিদারি কান্নার দৃশ্য দেখা যায়। পরে তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে বণিক সমিতির নেতার বাসায় নিয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে তাকে একবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাকে গাড়িতে নিয়ে এসে ফের বণিক সমিতির নেতার বাসায় রাখা হয়। কথা বলার মতো মানসিক পরিস্থিতি নেই তার।

সিফাতের বরাত দিয়ে রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, সকালে সিফাত দোকানে আসে। পরে বেলা ১১টার দিকে তার মা ও বোনদের কুপিয়ে হত্যার খবর আসে। আমার দোকানের পেছনেই তাদের বাসা। লোকজন জড়ো হয়ে ঘাতক যুবককে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

রায়পুর থানার ওসি শাহীন মিয়া বলেন, একই পরিবারের ৪ জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাদের বাড়ি কুমিল্লায়। পরিবারের একমাত্র ছেলে বেঁচে আছে। নিহতদের লাশ হাসপাতাল মর্গে আছে। ময়নাতদন্ত শেষে  স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

এদিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারের লাশ রাখা হয়েছে জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে। সে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার কার্তিক মজুমদারের ছেলে। পেশায় ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা ছিল। এক থেকে দেড় বছর আগে সিফাতদের বসবাসকৃত ভবনেই ভাড়া থাকতো অন্তর। তখনই তাদের সঙ্গে পরিচয় হয়। পূর্ব পরিচয়ের জেরে সিফাতদের কক্ষে ঢুকে এমন নির্মম ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। যদিও ঘটনার কারণ এখনো অজানা রয়ে গেছে।