জন্ম থেকেই দুটি পা অচল। স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগ কখনোই পাননি জিসান মোল্লা (২৫)। হাতের ওপর ভর করেই চলতে হয় জীবনের প্রতিটি পথ। প্রতিটি দিন তার কাছে একেকটি কঠিন সংগ্রাম। তবুও প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি তিনি। ভিক্ষাবৃত্তিকে না বলে সম্মানজনক জীবিকার পথ বেছে নিয়েছেন এই তরুণ। সীমিত মূলধন নিয়ে শিবচর পৌর বাজারে অস্থায়ীভাবে কাঁচামাল বিক্রি করে নিজের জীবন-সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর ইউনিয়নের বালাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা জিসান মোল্লার জীবনগল্প সংগ্রাম, আত্মসম্মান ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ। শিবচর পৌর বাজারের লালন মঞ্চসংলগ্ন এলাকায় ছোট্ট একটি অস্থায়ী দোকানে প্রতিদিন কাঁচা মরিচ, করলা, কচুর লতি ও মৌসুমি বিভিন্ন কাঁচামাল বিক্রি করেন তিনি।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মূলধনের অভাবে তার দোকানে পণ্যের পরিমাণ খুবই সীমিত। অধিকাংশ কাঁচামালই তিনি বাকিতে সংগ্রহ করেন। দিন শেষে বিক্রির টাকা দিয়ে প্রথমে দেনা পরিশোধ করেন। এরপর যা সামান্য অবশিষ্ট থাকে, তা দিয়েই চলে তার নিত্যদিনের জীবনযাপন।
জিসান জানান, জন্ম থেকেই তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার। ছয় বছর বয়সে পারিবারিক কলহের জেরে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর মা তাকে রেখে চলে যান। কিছুদিন পর বাবাও মারা যান। এতিম হয়ে পড়া জিসানকে দাদা-দাদি লালন-পালন করেন।
তিনি বলেন, শারীরিক সমস্যার কারণে ভারী কোনো কাজ করতে পারি না। অনেক কষ্ট হলেও কখনো ভিক্ষা করতে চাইনি। শুরুতে মাত্র ৭০০ টাকা পুঁজি নিয়ে বাড়ির পাশে বাঁশের মাচায় ছোট একটি দোকান করেছিলাম। মূলধনের অভাবে সেটি টিকিয়ে রাখতে পারিনি। পরে শিবচর বাজারে এসে বাকিতে দুই-তিন ধরনের কাঁচামাল এনে বিক্রি শুরু করি। এখনও সেইভাবেই চলছে।
তিনি আরও বলেন, দোকানে বেশি পণ্য রাখতে পারি না, তাই বিক্রিও কম হয়। আবার মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযানের কারণে দোকান সরিয়ে নিতে হয়। এতে ব্যবসায় আরও ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
চলাচলই জিসানের সবচেয়ে বড় কষ্ট। বাড়ি থেকে প্রধান সড়ক পর্যন্ত ইটের রাস্তা হওয়ায় প্রতিদিন হাতের ওপর ভর দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে তার হাত-পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। বর্ষাকালে কাদামাটিতে ভরা রাস্তা এবং যানবাহনের সংকটের কারণে অনেক সময় বাজারে আসাও সম্ভব হয় না।
জিসান বলেন, আমি কারও কাছে ভিক্ষা চাই না। শুধু চাই একটু সহযোগিতা, যাতে নিজের পরিশ্রমে ভালোভাবে বাঁচতে পারি। যদি একটি হুইলচেয়ার, চালের কার্ড কিংবা ব্যবসার জন্য কিছু মূলধন পেতাম, তাহলে দোকান বড় করতে পারতাম এবং আরও স্বাবলম্বী হতে পারতাম।
স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই জিসানকে সংগ্রাম করতে দেখছি। বাবা-মা হারিয়ে অনেক কষ্টে বড় হয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও সে ভিক্ষা না করে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করছে। সরকার কিংবা সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা যদি একটি স্থায়ী দোকানঘর ও কিছু মূলধনের ব্যবস্থা করে দেন, তাহলে সে নিজের কর্মে আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারবে।
স্থানীয়দের মতে, আত্মসম্মানবোধ ও কর্মনিষ্ঠার কারণে জিসান এখন অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার নাম। সীমাহীন প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি করুণা নয়, নিজের শ্রমের বিনিময়ে সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ. এম. ইবনে মিজান বলেন, প্রতিবন্ধী হয়েও জিসান যেভাবে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি ইতোমধ্যে প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় রয়েছেন। সরকারি বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তাকে আরও কী ধরনের সহায়তা দেওয়া যায়, সে বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব।
জিসানের গল্প শুধু একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণের জীবনসংগ্রামের কাহিনি নয়; এটি আত্মসম্মান, অধ্যবসায় এবং অদম্য মানসিক শক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সমাজ ও রাষ্ট্রের সামান্য সহায়তা পেলে তার মতো সংগ্রামী মানুষ শুধু নিজের জীবনই বদলাতে পারবেন না, অন্যদের জন্যও হয়ে উঠতে পারেন প্রেরণার প্রতীক।

