ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মানিকগঞ্জ পৌরসভা

টাকা ছাড়া বিলে স্বাক্ষর করেন না নির্বাহী প্রকৌশলী

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মার্চ ২৮, ২০২৬, ০৭:৪৪ পিএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

মানিকগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিলের বিপরীতে অর্থ দাবি এবং চাহিদামতো টাকা না দেওয়ায় ঠিকাদারের ফাইলের গুরুত্বপূর্ণ নথি ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।

পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ও কর্মচারীদের হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে জেলা প্রশাসক ও পৌরসভার প্রশাসকের বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এক ঠিকাদারের ছেলে রুবেল। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস দিয়েছেন পৌর প্রশাসক।

ঠিকাদার কিতাব আলীর ছেলে রুবেল জানান, তার বাবা পৌরসভার একজন ঠিকাদার ছিলেন। ছয় মাস আগে তার বাবা মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি পৌরসভার বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করলেও এখনো সেসব কাজের বিল পাওয়া যায়নি।

পৌরসভায় গিয়ে ওইসব কাজের নথিপত্র সংগ্রহের জন্য প্রতিটি ফাইলের জন্য কিতাব আলীর ছেলে রুবেলের কাছ থেকে দুই থেকে তিন হাজার টাকা করে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ফাইলগুলো সংগ্রহের পর বিলের জন্য তিনি প্রকৌশলী আব্দুল বাতেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেনের কাছে পাঠানো হয়। সেখানে গেলে নির্বাহী প্রকৌশলী ১০ লাখ ১০ হাজার টাকার পাঁচটি বিলের বিপরীতে ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন বলে রুবেলের অভিযোগ। পরে তাকে পুনরায় প্রকৌশলী বাতেনের কাছে পাঠানো হয়।

রুবেলের অভিযোগ, পরে মাস্টাররোলের কর্মচারী শাকিল তার কাছে ফাইলে স্বাক্ষরের জন্য প্রথমে প্রকৌশলী বাতেনের জন্য সাত হাজার টাকা এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর জন্য ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। নিরুপায় হয়ে তিনি প্রথমে ২০ হাজার এবং পরে ৩০ হাজার টাকা দেন। এছাড়া শাকিল কাজ করে দেওয়ার জন্য আরও আড়াই হাজার টাকা নেন।

এরপর নির্বাহী প্রকৌশলী ফাইলে স্বাক্ষর করেন এবং বাকি টাকার জন্য চাপ দেন বলে অভিযোগ করেন রুবেল। এ নিয়ে তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন ফাইলের কার্যাদেশ ছিঁড়ে ফেলেন এবং তাকে পৌরসভায় প্রবেশ করতে নিষেধ করেন বলেও তিনি দাবি করেন।

রুবেল আরও বলেন, তার বাবার মৃত্যুর পর আগের নির্বাহী প্রকৌশলীর সময়কার কিছু কাজের বিল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী টাকা ছাড়া কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার পর বাকি টাকা বিল পাওয়ার পর দেওয়ার কথা থাকলেও তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয় এবং ফাইল ছিঁড়ে ফেলা হয়। গুরুত্বপূর্ণ কাগজ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি পাঁচটি ফাইল নিজের হেফাজতে রেখেছেন বলেও জানান।

অপর ঠিকাদার আল রাফি বলেন, তার মেসার্স রাফি ও রিকা নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে পৌরসভার উন্নয়নমূলক কাজ করছে। প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হলেও এখনো প্রায় এক কোটি টাকার বিল বাকি রয়েছে। অগ্রিম টাকা ছাড়া ফাইলে স্বাক্ষর না করার কারণে কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে বলেও অভিযোগ তার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদার বলেন, নিয়ম মেনে কাজ করলেও শতকরা ৭ ভাগ পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়, যা পৌরসভায় অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, এ অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ-বাটোয়ারা হয়। এছাড়া কিছু প্রকল্পে আরও বেশি হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী আব্দুল বাতেন বলেন, রুবেল বিলের জন্য এসেছিল, তাকে নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে যেতে বলা হয়েছে। তার সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন বলেন, একটি ফাইলে স্বাক্ষর করতে গিয়ে দেখা যায় কার্যাদেশ নেই এবং কাজগুলো হয়েছে কি না তা নিশ্চিত নন।

পুরাতন কাজের বিল না দেওয়ার বিষয়ে পৌরসভায় অলিখিত সিদ্ধান্ত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে ঘুষ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

পৌরসভার প্রশাসক জয়া মারিয়া পেরেরা বলেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।