ময়মনসিংহের নান্দাইলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গায় সরকারি ডাক ছাড়া অবৈধ গরুর বাজার উচ্ছেদ শুধু কাগজে-কলমে। বাস্তবে তিনবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ হলেও রহস্যজনক কারণে উচ্ছেদ অভিযান চলছে না। অভিযোগ রয়েছে, গত এক বছরে প্রতি বৃহস্পতিবার স্থানীয় প্রশাসন ও একটি মহল নিয়মবহির্ভূতভাবে দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে অবৈধ এসব বাজার পরিচালনা করে।
গত চার মাসে তিনবার ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করেন ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক। কিন্তু কাগজপত্রে বারবার ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ হলেও অবৈধ বাজার উচ্ছেদ বা বন্ধে নেই কোনো কার্যত উদ্যোগ। এতে একদিকে যেমন সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে মহাসড়কের পাশে গরুর বাজার বসায় দুর্ভোগে পড়ছেন এই সড়কে চলাচলকারীরা। দখল হয়েছে সড়ক ও জনপথের প্রায় তিন একর জায়গা।
জানা যায়, কিশোরগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় গত বছরের ২৭ নভেম্বর ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক বরাবর ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের আবেদন করেন।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ময়মনসিংহ (রঘুরামপুর)-কিশোরগঞ্জ (বটতলী)-ভৈরব বাজার সড়কের ৪৭তম কি.মি.-এ (নান্দাইল-চৌরাস্তা) অংশে সওজ অধিগ্রহণকৃত সরকারি ভূমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ গরুর হাট এবং বিবিধ অবৈধ স্থাপনা অপসারণে জন্য উচ্ছেদ কার্যক্রম চলাকালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তা ও তার টিমের সদস্যদের আইনগত নির্দেশনা প্রদান ও ম্যাজিস্ট্রেরিয়ান দায়িত্ব পালনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজন।
কিশোরগঞ্জ সড়ক বিভাগের আবেদনের প্রেক্ষিতে নান্দাইল উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রেবেকা সুলতানা ডলিকে নিয়োগ করা হয়।
সেই সাথে নিয়োগকৃত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব পালন শেষে জেলা প্রশাসক বরাবর প্রতিবেদন প্রেরণ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও নিয়োগকৃত ম্যাজিস্ট্রেট রেবেকা সুলতানা ডলি দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করেন।
এর আগে, গত বছরের ২৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জ সড়ক বিভাগের একই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মুফিদুল আলম এই অবৈধ গরুর হাট এবং বিবিধ অবৈধ স্থাপনা অপসারণের জন্য কার্যক্রম পরিচালনায় ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল দায়িত্ব পালনের জন্য তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফয়জুর রহমানকে নিয়োগ প্রদান করেন।
কিন্তু ফয়জুর রহমান দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় আবারও গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ সড়ক বিভাগ এর একই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মুফিদুল আলম উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকারিয়াকে নিয়োগ করেন। তিনিও দায়িত্ব পালন করেননি।
এ ছাড়াও গত বছরের ৩০ নভেম্বর নান্দাইল চৌরাস্তা অংশে সওজ অধিগ্রহণকৃত সরকারি ভূমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ গরুর হাট এবং বিবিধ অবৈধ স্থাপনা অপসারণে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় থেকে লিখিতভাবে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসককে নির্দেশ প্রদান করা হয়।
এতসব কার্যক্রম শুধুমাত্র কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবে দীর্ঘদিন যাবৎ সড়ক ও জনপথের নিজস্ব জায়গায় অবৈধভাবে গরুর বাজার পরিচালনা করে আসছে একটি মহল।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, ‘এই জায়গায়টি অবৈধ বাজার ও স্থাপনা করে দীর্ঘদিন যাবৎ বেদখল করে রেখেছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহল। সড়কের জায়গা মুক্ত করতে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কাছ কয়েকবার আবেদন জানিয়েছি। প্রথম ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ হওয়ার কিছুদিন পর ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয় বদলি হয়ে চলে যায়। পরে আবারও আবেদন করলে নান্দাইলের সহকারী কমিশনার ভূমিকে ম্যাজিস্ট্র্যাট নিয়োগ করা হয়। আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছি। সহকারী ভূমি (কমিশনার) যেদিন সময় দিবেন সেদিনই আমরা অভিযান পরিচালনা করতে চাই।’
এ বিষয়ে বর্তমানে উচ্ছেদ অভিযানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও নান্দাইল উপজেলার সহকারী কমিশনার ভূমি রেবেকা সুলতানা ডলি বলেন, ‘এখন নির্বাচনি কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। এই বিষয়টি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসক ও রাজস্ব স্যারকে জানিয়েছি। ওনারা ব্যবস্থা নিবেন। নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগে দায়িত্ব পেয়েও কেন তা পালন করেননি এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অফিসে এসে কথা বলতে বলেন এবং ফোন কল কেটে দেন।’
এদিকে এই অবৈধ বাজার বন্ধ ও উচ্ছেদের জন্য উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছেন স্থানীয় এক আল আমিন খান নামে এক ব্যক্তি।
আল আমিন খান বলেন, ‘আমাদের নান্দাইল চৌরাস্তা মোড়ে দীর্ঘদিন যাবৎ অবৈধভাবে সওজের জায়গা বেদখল করে গরুর বাজার পরিচালনা করে আসছে। বাজারের ইজারা আদায়ের টাকা সরকারি কোষাগার জামা না দিয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে সাথে নিয়ে ভাগাভাগি করছেন।’
জামাল উদ্দিন নামে স্থানীয় আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘গত বছর নান্দাইলের এই অবৈধ বাজার বন্ধে বিভাগীয় কমিশনারের নিকট লিখিত অভিযোগ দেই। সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গায় দেড় বছর যাবত স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট অবৈধ গরুর বাজার বসিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকার অধিক ভুয়া গরুর রশিদ ছাপিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে এবং এখনো নিচ্ছে। তা ছাড়া অবৈধ গরুর বাজারটি সরকার অনুমোদিত নয়। বাজারের কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে দুর্ঘটনার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।’
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি অবগত হয়েছি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
-20260115160129.webp)


