ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন, মাছ ও পোলট্রি খাতে ধস

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

গ্রীষ্মের শুরুতেই ময়মনসিংহে বিদ্যুতের তীব্র লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে জনজীবন। দিনের পর দিন বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে, চরম দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ। জেলায় গ্রিডে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা।

জেলা ও উপজেলা শহরের তুলনায় পল্লী এবং গ্রামীণ জনপদে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে প্রভাব পড়েছে প্রধান অর্থনৈতিক খাত মৎস্য ও পোলট্রি খামারে। অন্যদিকে বেকায়দায় পড়েছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা।

জেলার ঈশ্বরগঞ্জ, গৌরীপুর, তারাকান্দা, ফুলপুর, ধোবাউড়া, ফুলবাড়িয়া এবং মুক্তাগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সারাদিনে ৩ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এই লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বেশি।

ত্রিশাল উপজেলার কোনাবাড়ি গ্রামের শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। অন্ধকারে বা পর্যাপ্ত আলো না থাকায় তারা মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারছে না, ফলে তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না।’

নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়ে নান্দাইল উপজেলার এসএসসি পরীক্ষার্থী এমরান হাসান বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে পড়ার রুটিন ঠিক রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়ছে। আমরা চাই, বিদ্যুতের এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হোক, যাতে আমরা নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করতে পারি।’

ত্রিশাল উপজেলার ভন্ডোখোলা গ্রামের মাছ চাষি হারেজ আলী বলেন, ‘বৈশাখ মাসে পুকুরে সারাক্ষণ পানি দিতে হয়। দিনের বড় একটি সময় লোডশেডিং থাকায় সেচ কার্যক্রম বন্ধ থাকছে, এতে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।’

ফুলবাড়িয়া উপজেলার আছিম এলাকার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গরমে আমার পোলট্রি খামারের মুরগি মারা যাচ্ছে। বিকল্পভাবে টিনের চালে পানি ছিটাতে হচ্ছে। অনেকে জেনারেটর বা আইপিএসের মাধ্যমে শেডে ফ্যানের ব্যবস্থা করেছেন। আমার মতো এই এলাকার অনেক খামারির মুরগি মারা যাচ্ছে।’

তথ্যমতে, ময়মনসিংহ রুরাল পাওয়ার কোম্পানির প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১০ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাসের স্বল্পতায় বর্তমানে উৎপাদন নেমে ৫০ মেগাওয়াটের নিচে। জামালপুর ইউনাইটেড পাওয়ার ডেভেলপমেন্টের প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩১৫ মেগাওয়াট। জ্বালানি সংকটের কারণে সেখানে উৎপাদন হচ্ছে প্রতিদিন মাত্র ৬৬ থেকে ৬৭ মেগাওয়াট।

ময়মনসিংহ গ্রিডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুর হক জানান, প্রতিনিয়ত বিদ্যুতের চাহিদা উঠানামা করে। ময়মনসিংহ জোনে (ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইল) বিদ্যুতের চাহিদা থাকে (প্রচণ্ড গরমে সন্ধ্যায়) ১২০০ থেকে ১৩০০ মেগাওয়াট। সে ক্ষেত্রে আমরা পাই ৭০০ থেকে ৯০০ মেগাওয়াট।

ময়মনসিংহ জেলায় সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা থাকে (প্রচণ্ড গরমে সন্ধ্যায়) ৪০০ মেগাওয়াট। আর স্বাভাবিকভাবে চাহিদা থাকে ২৫০ মেগাওয়াট।

ময়মনসিংহ দক্ষিণ বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুব্রত রায় জানান, ময়মনসিংহ জোনে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফ-পিক আওয়ারে ৪৫০ থেকে ৪৬০ মেগাওয়াট, পিক আওয়ারে ৫০০ থেকে ৫২০ মেগাওয়াট এবং দিনের অন্য সময়ে ৪৩০ থেকে ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকে। কিন্তু প্রতিদিনই গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট ঘাটতি থেকেই যায়। ফলে লোডশেডিং করতে হয়।

ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এর জেনারেল ম্যানেজার মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘এই সমিতির এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ৭০ থেকে ৮০ মেগাওয়াট। পিক আওয়ারে বেশি গরমে ২০ থেকে ২৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়।’

ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার মো. জনাব আলী জানান, এই সমিতির অধীন এলাকায় ১৬০ থেকে ১৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকে। আমরা ৮০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাই। ফলে আমাদের বাধ্য হয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হয়।

ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর ডিজিএম (টেকনিক্যাল) আব্দুল মজিদ বলেন, ‘এই সমিতির অধীন এলাকায় ৩০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। আমরা পিক ও অফ-পিক মিলিয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ লোডশেডিং করতে বাধ্য হই।’