ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আইসিইউ না থাকায় হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।
সোমবার (১১ মে) সকালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৭ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সকাল ৬টার দিকে মারা যাওয়া সাত মাস বয়সী শিশুটিকে গত ৮ মে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ময়মনসিংহ অঞ্চলের হাম পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়াচ্ছে শিশুর অভিভাবক ও স্বজনদের। অতিরিক্ত ব্যয়ের পাশাপাশি তাদের পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি।
আদরের শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেই অভিভাবকেরা ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। সংক্রামক ব্যাধি হাম কেড়ে নিচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের গত বছরের ২৪ মে জন্ম নেওয়া মেহেদী হাসান দেড় মাস আগে জ্বর-সর্দিতে আক্রান্ত হয়। পরে চিকিৎসকেরা তার শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত করেন।
প্রথমে তাকে ভর্তি করা হয় কিশোরগঞ্জের জহিরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে নেওয়া হয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
সেখানেও আশানুরূপ চিকিৎসা না পেয়ে গত শনিবার তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
এতে অতিরিক্ত ব্যয়ের পাশাপাশি একমাত্র সন্তানকে সুস্থ করে তুলতে চরম ভোগান্তির কথা জানান শিশুটির বাবা রাজমিস্ত্রি মনোয়ার হোসেন ও মা বৃষ্টি আক্তার।
মনোয়ার হোসেন বলেন, সন্তান অসুস্থ হলে টাকা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় না। সে জন্মের পর থেকেই নানা রোগে আক্রান্ত। হামে তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেছে। সারাক্ষণ অস্থিরতায় থাকে। কিশোরগঞ্জের দুই হাসপাতালে ভর্তি করানোর সময় প্রায় সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।
তবে ময়মনসিংহ মেডিকেলে আসার পর মাত্র দুটি ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। গত দেড় মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
শিশুটির মা বৃষ্টি আক্তার বলেন, আমাদের বয়স কম হওয়ায় সন্তান জন্মের পর থেকেই খিঁচুনির সমস্যা ছিল। এখন হামে অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। দেড় মাস আগে প্রথমে জ্বর, পরে চোখ ওঠে। সুস্থ হওয়ার পাঁচ দিন পর নিউমোনিয়া হয়। তারপর ধরা পড়ে হাম। শিশুকে নিয়ে দৌড়ঝাঁপে ভোগান্তির পাশাপাশি প্রচুর টাকাও খরচ হচ্ছে। এতে আমরা হাঁপিয়ে উঠেছি।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি এলাকার দোকানি পারভেজ মোশাররফ ও তার স্ত্রী রুপা আক্তার তাদের দেড় বছরের একমাত্র সন্তান রাফসান আয়ারকে বাঁচাতে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন। সবশেষ গত ৫ মে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
পারভেজ মোশাররফ বলেন, গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাফসান জ্বর থেকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। তখন তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচ দিন ভর্তি রাখা হয়। পরে ২৬ এপ্রিল তাকে হামের টিকা দেওয়া হয়।
এরপর আবার জ্বর এলে মাওনা আল হেরা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা ময়মনসিংহে পাঠান। এখনো তার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। তবে আগের চেয়ে কিছুটা ভালো আছে। আমাদের সন্তানটা শুধু সুস্থ হোক—এটাই আল্লাহর কাছে চাওয়া।
রুপা আক্তার বলেন, সন্তান অসুস্থ থাকলে মায়ের কেমন লাগে, সেটা শুধু মা-ই বুঝতে পারে। গত দেড় মাস ধরে সবকিছু বাদ দিয়ে ছেলের পেছনেই সময় দিচ্ছি। সন্তান সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কোনো শান্তি নেই।
হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন ও শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহা. গোলাম মাওলা বলেন, আইসিইউ না থাকায় শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
হাসপাতাল থেকে যতটুকু সম্ভব ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। খুব বেশি ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে না। এই সময়ে একটি শিশু আইসিইউ অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। সেটি থাকলে হয়তো এত শিশুর মৃত্যু হতো না। তবে শিশুদের জন্য আইসিইউ স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, গত ১৭ মার্চ থেকে ১১ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৪৪ শিশু।
এর মধ্যে ১ হাজার ১২৭ শিশু সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ২৮ শিশুর। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছে ২৪ শিশু, হাসপাতাল ছেড়েছে ৩৫ শিশু। বর্তমানে ৬৪ শয্যার ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ৮৯ শিশু।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন