আসানসোলের এক রুটির দোকানে কাজ করছিলেন কিশোর নজরুল। সেখানে তার প্রতিভায় মুগ্ধ হন দারোগা রফিজউল্লাহ। ১৯১৪ সালে তাকে নিয়ে আসেন ময়মনসিংহের ত্রিশালে। সেই থেকে শুরু হয় কবির জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ত্রিশালের কাজীর শিমলার দারোগাবাড়ি আর নামাপাড়ার বিচুতিয়া ব্যাপারীবাড়ি—এই দুই ঠিকানায় কাটে নজরুলের জীবনের প্রায় এক বছর। দরিরামপুর হাইস্কুলে যেতে প্রতিদিন সাত কিলোমিটার হেঁটে পথ পাড়ি দিতেন কিশোর কবি। অল্প সময়ের এই অবস্থানেই তিনি ত্রিশালের মানুষের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য গেঁথে যান।
পেরিয়ে গেছে শতাধিক বছর। সেই দুটি বাড়ি আজ স্মৃতিকেন্দ্র। কোথাও কবির ব্যবহৃত কাঠের খাট, কোথাও পুরোনো গ্রামোফোন এবং দেওয়ালজুড়ে হাতে লেখা কবিতা। দেশের নানা প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ভিড় করেন এখানে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে কবির স্মৃতিধন্য নানা স্থান। যে বটগাছের নিচে বসে কবি সাহিত্যচর্চা করতেন, সেটিও পড়ে আছে অযত্নে।
ত্রিশাল উপজেলার কাজীর শিমলা গ্রামে দারোগা রফিজউল্লাহর বাড়িই ছিল কবি নজরুলের প্রথম আবাস। এখানেই তিনি নতুনভাবে শিক্ষাজীবন শুরুর সুযোগ লাভ করেন। দারোগা সাহেব প্রথমে নজরুলকে ভর্তি করানোর জন্য ময়মনসিংহ সিটি স্কুলে পাঠান। কিন্তু জায়গিরের ব্যবস্থা না হওয়ায় সেখানে পড়াশোনার সুযোগ হয়নি তার। পরে তাকে ভর্তি করানো হয় দরিরামপুর হাইস্কুলে, যা বর্তমানে সরকারি নজরুল একাডেমি নামে পরিচিত।
পরবর্তী সময়ে নজরুলের থাকার জায়গা হয় ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া ব্যাপারীবাড়িতে। বাড়ির পূর্বপাশে পুকুরের ধারে ছোট একটি ঘরে থাকতেন তিনি। সেখানেই কাটে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময়।
কবির বসবাসের এই দুই বাড়ি সংরক্ষণ করে গড়ে তোলা হয়েছে নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র। নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে নির্মিত কেন্দ্র দুটি বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। কাজীর শিমলার দারোগাবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দ্বিতল ভবনের নিচতলায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে কাঠের তৈরি একটি খাট, যেখানে থাকতেন কবি নজরুল। একই তলায় রয়েছে একটি ছোট মিলনায়তন এবং ওপরতলায় গড়ে তোলা হয়েছে পাঠাগার। সেখানে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন বই এবং কবির বংশধরদের ছবি।
অন্যদিকে, বিচুতিয়া ব্যাপারীবাড়ির স্মৃতিকেন্দ্রে দেখা যায়, তিনতলা ভবনের নিচতলায় রয়েছে মিলনায়তন, দ্বিতীয় তলায় দাপ্তরিক কার্যক্রম এবং তৃতীয় তলায় গড়ে তোলা হয়েছে স্মৃতিকেন্দ্র ও গ্রন্থাগার। এখানে কবির একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে একটি পুরোনো গ্রামোফোন। দেওয়ালজুড়ে রয়েছে কবির নানা ছবি এবং তাঁর হাতের লেখা কবিতা বাঁধাই করে টাঙানো হয়েছে।
স্মৃতিকেন্দ্রটির চারপাশে সবুজ গাছপালা এবং সামনে শানবাঁধানো পুকুরঘাট—সব মিলিয়ে মনোরম পরিবেশ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। মূল ভবনের পাশেই রয়েছে কবির থাকার সেই ঐতিহাসিক ঘরটি। মূল কাঠামো ঠিক রেখে নতুনভাবে টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে।
বিচুতিয়া ব্যাপারীবাড়ির বংশধর মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘প্রতিবছর কবির জন্মজয়ন্তীতে এখানে বড় আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গুণীজনরা আসেন। দিনটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের।’
স্মৃতিকেন্দ্রের সহকারী পরিচালক মো. ফয়জুল্লাহ রোমেল বলেন, বিচুতিয়া ব্যাপারীবাড়ির কেন্দ্র থেকেই দুটি স্মৃতিকেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বর্তমানে দুই কেন্দ্রেই শিশুদের জন্য নজরুলসংগীত প্রশিক্ষণ চালু রয়েছে। বিচুতিয়া ব্যাপারীবাড়িতে ৩২ জন এবং দারোগাবাড়িতে ৩১ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।

