ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মেডিকেলে চান্স পেলেন বাবা-মা হারানো অনামিকা

বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২০, ২০২৫, ১২:২১ পিএম
অনামিকা। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার সোহাসা গ্রামের মৃত আকাব আলীর মেয়ে অনামিকার জীবন গল্প যেন তার নামের মতোই অনন্য। ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন অনামিকা, কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর আঘাতে সেই পথটি হয়ে ওঠে আরও কঠিন।

নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাকে হারিয়ে নিঃস্ব ও একা হয়ে পড়ে অনামিকা। মায়ের স্নেহ ও ভালোবাসা তখনো তার মনে তাজা সেই সময়েই বুঝতে পারে, জীবন কত নির্মম হতে পারে।

তবু তিনি হাল ছাড়েননি। স্কুল-কলেজের বইয়ের ভাঁজে, প্রতিদিনের ক্লান্তিকর পথচলায়, স্বপ্নের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে কখনো নিজের দুর্বলতা দেখাননি। মাকে হারানোর শোক সামলে সামনের পথে এগোতে শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই বাবার মৃত্যু যেন আরেকবার পথ রুদ্ধ করে দেয়।

একদিকে স্বপ্নের চাপ, অন্যদিকে সবচেয়ে আপনজনদের হারানোর বেদনা। দু’দিকেরই টান ছিল বেদনা আর অশ্রুর। কিন্তু অনামিকা শোককে দুর্বলতা নয়, শক্তি হিসেবে নিয়েছেন। বাবার-মায়ের স্বপ্ন পূরণে দমে যাননি তিনি।

বড় বোন, বড় ভাই এবং মামার অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসা তাকে আবারও দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। তাদের উৎসাহ ও বিশ্বাসই ছিল অনামিকার আত্মবিশ্বাসের জ্বালানি।

আর সেই সাহস নিয়েই অবশেষে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করেছেন অনামিকা। এটি শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নয়; এটি একজন এতিম কন্যার জীবনে আলো ছড়ানোর মুহূর্ত, যা বদলগাছীর মানুষের মুখে এনে দিয়েছে গর্ব ও অনুপ্রেরণা।

অনামিকা ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও পরিশ্রমী মেয়ে। জেএসসি পরীক্ষায় পেয়েছেন বৃত্তি। লাবণ্য প্রভা বালিকা ও কমিউনিটি হাইস্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এবং রাজশাহী সিটি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন।

প্রতিবেশীরা বলেন, সে এতিম মেয়ে। পড়াশোনা ছাড়া কিছু বোঝে না। মেয়েটা ডাক্তার হয়ে গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করুক এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লাবণ্য প্রভা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাবা-মা হারিয়ে তার সাফল্যের পথ অনেক কঠিন হয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো ছিটকে পড়বে।

কিন্তু শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেয়েছে, এতে আমরা আনন্দিত। আশা করি সে দেশের মঙ্গল বয়ে আনতে পারবে।

অনামিকা বলেন, বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল আমাকে ডাক্তার বানানো। তাদের মৃত্যু আমার হাতে নেই, কিন্তু স্বপ্ন পূরণ আমার হাতে। আমি শুধু সেই কাজটি করেছি।

তবে আমার ভাই, বোন, মামা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সহযোগিতা না হলে মনোবল ভেঙে যেত। দোয়া করবেন, আমি গ্রামের মানুষের জন্য অনেক কিছু করার ইচ্ছা রাখি।

পথ এখানেই শেষ নয়। চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্য পূরণ করতে তাকে আরও কয়েক বছর লড়তে হবে। তবে অনামিকার চোখে এখন আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক, আর বাবা-মায়ের অপূর্ণ স্বপ্নই তার প্রধান প্রেরণা।