নরসিংদী পৌরসভায় ভিজিএফের চাল বিতরণে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রতি উপকারভোগীর জন্য বরাদ্দকৃত ১০ কেজি চাল থেকে অভিনব কায়দায় এক থেকে দেড় কেজি করে কম দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে বুধবার ও বৃহস্পতিবার সরেজমিনে নরসিংদী পৌরসভায় গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৮টার আগেই শত শত নারী-পুরুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। চাল দেওয়ার স্থানে সারি সারি চালের বস্তা রাখা হয়েছে এবং বস্তা খুলে নিচে চাল ঢালা হয়েছে। পাশে রয়েছে পাঁচটি টিনের বালতি। এর মধ্যে একটি বালতি নীল রঙের এবং অপর চারটি সাদা রঙের।
সকাল ৮টা থেকে চাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে নরসিংদী পৌর কর্তৃপক্ষ। লাইনে দাঁড়ানো নারী-পুরুষ যার যার কার্ড জমা দিয়ে ১০ কেজি চাল প্রাপ্তির স্বাক্ষর শিটে টিপসই দিয়ে চাল নিয়ে চলে যান। কর্তৃপক্ষ সাদা রঙের চারটি বালতির সাহায্যে চাল দিচ্ছিলেন। অপর নীল রঙের বালতিটি দিয়ে কাউকেই চাল দেওয়া হয়নি। তবে ওই বালতিটি চাল দিয়ে ভরে রাখা হয়েছিল।
যারা চাল বিতরণ করছেন তাদের মধ্যে মো. মতিউল্লাহ নামে একজনের কাছে চাল কম দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আমরা বস্তাপ্রতি চাল কম পাই, তাই সাড়ে ৯ কেজি করে চাল দিচ্ছি। এর বেশি দেওয়ার সুযোগ নেই।’
একাধিক সুবিধাভোগী জানান, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সরকারের দেওয়া ভিজিএফ কার্ডের চাল প্রতি পরিবারের জন্য ১০ কেজি করে বরাদ্দ থাকলেও তাদের দেওয়া হয়েছে সাড়ে ৮ থেকে ৯ কেজি।
পৌরসভায় চাল নিতে আসা ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রেহেনা বেগম বলেন, ‘দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে টিপসই দিয়ে অনেক কষ্ট করে চাল নিয়েছি। তবে চাল নিয়ে বাড়িতে গিয়ে সন্দেহ হলে স্থানীয় একটি দোকানে গিয়ে মেপে দেখি মাত্র ৮ কেজি ৯০০ গ্রাম চাল রয়েছে। অথচ আমাকে ১০ কেজি চাল দেওয়ার কথা। এ কথা আর কাকে বলব? যা পেয়েছি তা নিয়েই ভালো আছি, কী আর করব?’
৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সামসুন্নাহার জানান, ১০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা। কিন্তু বাড়িতে এনে মেপে দেখি এক কেজিই কম। আমাদের ন্যায্য অধিকার আমরা না পেলে কার কাছে যাব? আমরা গরিব মানুষ, আমাদের আসলে নীরবে সহ্য করা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। প্রতিবাদ করলেই ভিজিএফ কার্ড ফেরত নেওয়ার হুমকিও রয়েছে।
জানা গেছে, নরসিংদী পৌরসভার ৪ হাজার ৬২৫ জন সুবিধাভোগীর প্রত্যেককে ১০ কেজি করে চাল দেওয়ার জন্য ৩০ কেজি বস্তার ১ হাজার ৫৪০টি বস্তা চাল পৌরসভায় আসে। সোমবার (৯ মার্চ) এই চাল বিতরণ শুরু হয় এবং বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিতরণ কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সকাল ১০টা পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ২০০ জনের বেশি উপকারভোগী চাল নিয়ে গেছেন বলে জানান পৌরসভার সচিব মাহফুজুর রহমান। তবে বিতরণের সময় সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে এক-দেড় কেজি করে চাল রেখে দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এলাকার সচেতন মহল বলছে, ৪ হাজার ৬২৫ জন সুবিধাভোগীকে যদি এক কেজি করে কম দেওয়া হয়, তাহলে ৪ হাজার ৬২৫ কেজি চাল, যা প্রায় ১৫৫ বস্তা চালের সমান, কৌশলে রেখে দেওয়া হচ্ছে। পরে সেই চাল সুবিধামতো সময়ে আত্মসাৎ করা হতে পারে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ ছালেহ উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের গুদাম থেকে যে চালের বস্তাগুলো নির্ধারিত গন্তব্যে যায়, সেগুলোর কোনো বস্তাতেই চাল কম থাকার সুযোগ নেই। তবে প্রতি বস্তায় এক-দেড়শ গ্রাম এদিক-সেদিক হতে পারে। চাল কম দেওয়ার ব্যাপারে বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।’
এ বিষয়ে নরসিংদী পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (গোপনীয় শাখা) এফ. এম. নাঈম হাসান শুভ বলেন, ‘প্রতিটি সুবিধাভোগীর জন্য বরাদ্দকৃত ১০ কেজি করে চাল কোনো বছরই পুরোপুরি আসে না। এইমাত্র কয়েকটি পৌরসভায় খোঁজ নিলাম, সব জায়গায় একই অবস্থা। তবে ৯ কেজি ৫০০ গ্রামের নিচে চাল দেওয়ার সুযোগ নেই। ঘোড়াশাল সেন্টার, মাধবদী সেন্টারসহ বিভিন্ন স্থানে এভাবেই চাল দেওয়া হচ্ছে। গত বছর কি এ বিষয়ে খবর করেছেন? বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চাল বিতরণ করা হচ্ছে। আপনারা কেন্দ্রীয়ভাবে যোগাযোগ করেন।’
নরসিংদী জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। পরে বিস্তারিত জানানো হবে।’



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন