উজানে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের প্রভাবে উত্তরের জীবনরেখা তিস্তা নদী শুষ্ক মৌসুমে কার্যত মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প এখন বড় সংকটে। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সেচের লক্ষ্যমাত্রা অর্ধেকও পূরণ করতে পারছে না পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
ফলে নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার লাখো কৃষক নির্ধারিত সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিকল্প সেচে তিনগুন খরচ করতে হচ্ছে তাদের।
পাউবো সূত্র জানায়, বর্ষা মৌসুমে তিস্তায় গড়ে প্রায় দুই লাখ কিউসেক পানি প্রবাহ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে তা নেমে আসে গড়ে দুই হাজার কিউসেকে। কখনো কখনো প্রবাহ ৫০০ কিউসেকেও নেমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেচ প্রকল্পে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে খাল সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হলেও মূল নদীতে পানি না থাকায় অধিকাংশ সেচনালা কার্যত অচল পড়ে আছে।
তিস্তা ব্যারাজ থেকে শুরু হয়ে প্রকল্পের ৭৬৬ কিলোমিটার খাল নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার ১২ উপজেলায় বিস্তৃত। ২০২১ সালে শুরু হওয়া ‘তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকার পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ৪৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে খাল সম্প্রসারণের কাজ চলছে। পাউবোর দাবি, প্রকল্পের কাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ শেষ। তবে মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, ক্যানেল নির্মাণ শেষ হলেও অনেক স্থানে আজ পর্যন্ত একবারও তিস্তার পানি পৌঁছায়নি। ফলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কৃষক বিকল্প সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
নীলফামারীর একাধিক কৃষক জানান, ক্যানেল পাশে থাকলেও পানি না থাকায় তাদের বৈদ্যুতিক ও ডিজেলচালিত মেশিন দিয়ে পানি জমিতে দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। কৃষক জাকারিয়া সরকার বলেন, ‘ক্যানেলের পানি জমিতে দিতে বিঘাপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হতো। কিন্তু সেচ ক্যানেল থাকা সত্ত্বেও আমরা পানি পাচ্ছি না। ফলে আমাদের বৈদ্যুতিক পাম্প ব্যবহার করে পানি দিতে হচ্ছে। এতে বিঘাপ্রতি ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা বেশি খরচ হচ্ছে।’
কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় জমিতে পানি দেওয়ার জন্য ক্যানেল দিয়েছে। ভাঙা ক্যানেল ঠিক করে, কিন্তু পানির খবর নাই। এমনিতেই সার, বীজসহ সবকিছুর দাম বেশি। নদীর পানিতে সারও কম লাগে। প্রতি বছর বলে এই বছর পানি দেবে। কিন্তু পানি আর দেয় না।’
আরেক কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, ‘লাখ লাখ টাকা খরচ করে ভাঙা ক্যানেল ঠিক করল। কিন্তু ক্যানেলে পানি নাই। ক্যানেল থাকা সত্ত্বেও সেচ পাম্প দিয়ে পানি দিতে হচ্ছে। তাহলে ক্যানেল ঠিক করি লাভ কি হইল।’
তবে মাঠের কৃষকদের অভিযোগের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে খোদ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুই কর্মকর্তার তথ্যের বিভ্রান্তি। নদী যেখানে শুকিয়ে কাঠ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সরকারি নথিতে সেখানে নাকি পানির জোয়ার।
নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান বলেন, ‘জেলায় সেচের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ১০ হাজার কিউসেক পানির প্রয়োজন এবং তা পর্যাপ্ত আছে। যে ক্যানেলেই পানির চাহিদা আসছে, সেখানেই আমরা পানি প্রদান করছি।’
তবে ভিন্ন কথা বলছে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘তিস্তা ব্যারাজের উজানে ৭০০-২৫০০ কিউসেক পানি পাওয়া যাচ্ছে। তবে ব্যারাজের ভাটির প্রায় ১১০ কিলোমিটার তিস্তায় ১০০ কিউসেক পানিও সরবরাহ নেই।’
নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে সেচের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৪ হাজার ৩৭৮ হেক্টর। তিন দশক পেরিয়েও সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ হাজার হেক্টর। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পানিপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে এর অর্ধেকও অর্জন করা কঠিন হবে। দেড় হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো গড়ে উঠলেও মূল নদীতে পানি নিশ্চিত না হওয়ায় তিস্তা সেচ প্রকল্প এখন কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উত্তরের কৃষি ও কৃষকের জীবিকায়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন