রাজশাহীর তানোরে এক ব্যক্তি ‘কাজী’ পরিচয়ে বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি করে বহু বছর ধরে অবৈধভাবে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নামসর্বস্ব এই কাজীর ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন বহু মানুষ। তার নাম গোলাম রাব্বানী ধুলু। তিনি তানোর উপজেলার কলমা ইউনিয়নের রামনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার পিতা মৃত মোজাফ্ফর হোসেন।
এই নামসর্বস্ব কাজীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে কলমা ইউনিয়নে সরকার নিয়োগপ্রাপ্ত নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার (কাজী) মো. আহসান হাবিব বাদী হয়ে গত ১৩ এপ্রিল রাজশাহী জেলা প্রশাসক ও তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তবে অভিযোগের ৯ দিন পার হলেও রহস্যজনক কারণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কলমা ইউনিয়নের সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত কাজী মো. আহসান হাবিব, যার পিতার নাম মো. আতাউর রহমান এবং বাড়ি বিল্লী গ্রামে। কিন্তু এর আগ থেকেই গোলাম রাব্বানী ধুলু ওই এলাকার নিয়োগপ্রাপ্ত কাজী পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করে অসংখ্য বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি করে আসছেন।
সম্প্রতি গত ৩ এপ্রিল এক ঘটনায় স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাকের নোটিশ প্রদান করা হয়, যেখানে স্বাক্ষর করেন কথিত কাজী গোলাম রাব্বানী ধুলু। এ ধরনের নোটিশের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, তালাক প্রদানকারী ওই নারীর নাম মুনুয়ারা বেগম। তার পিতার নাম মো. মহিউদ্দিন এবং মাতা মোছা. ফাতেমা। তার স্থায়ী ঠিকানা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার নয়া গলাহাট জামতলা পীরপুকুর গ্রাম।
জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি ২০ হাজার টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করে ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক তানোর উপজেলার কুমড়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রশিদের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। পরে স্বামীকে চিররুগ্ণ ও পুরুষত্বহীন উল্লেখ করে ৩ এপ্রিল তালাক নোটিশ দেন তিনি। ওই নোটিশ প্রদান করেন গোলাম রাব্বানী ধুলু, যিনি এ বাবদ ৩ হাজার টাকা নেন।
অভিযোগ রয়েছে, নিজ গ্রামে ফার্মেসি ব্যবসার আড়ালে গোলাম রাব্বানী ধুলু ২০০২ সাল থেকে নিয়মিত বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি করে আসছেন।
এ জন্য তার কাছে সরকার নির্ধারিত বালাম বইয়ের মতো কাগজপত্র থাকলেও সেগুলো ভুয়া এবং আইনগত কোনো বৈধতা নেই। তার কোনো সরকারি নিবন্ধনও নেই। তবুও কথিত কাজীর পরিচয়ে তিনি বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ আয় করছেন।
এতে এলাকায় নিকাহ ও তালাক নিবন্ধনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং এক ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। তার দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। ভুয়া বিয়ে ও তালাকের কারণে নারী-পুরুষ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
চলতি বছরের ৩ এপ্রিল এমনই একটি ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া তিনি নিকাহনামা রেজিস্ট্রির সত্যায়িত অনুলিপিও প্রদান করছেন। বিয়ে বা তালাক রেজিস্ট্রির খরচের নামে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন।
গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর এরশাদ আলী ও জায়েদা বেগমের নিকাহনামার অনুলিপি থেকে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের বাড়ি তানোর উপজেলার ভালুকাকান্দর গ্রামে।
ভুয়া কাজীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে—এ বিষয়ে রাজশাহী জজকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনোয়ার হোসেন বাবু বলেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার জন্য একজন করে কাজী নিয়োগের বিধান রয়েছে। অবৈধভাবে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধনের দায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
দণ্ডবিধির ৪১৭ ধারায় সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। এ ছাড়া মুসলিম বিয়ে ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত সাজা হতে পারে।
এ বিষয়ে গোলাম রাব্বানী ধুলু বলেন, আমি ২০০২ সালে সংশ্লিষ্ট আইন মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ পেয়েছি। আমার নিয়োগ সম্পর্কে ডিআর অফিসও অবগত। আমি নিয়মিত বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি করে আসছি। বর্তমানে বাইরে যাই না, কেউ বাড়িতে এলে সেখানেই রেজিস্ট্রি করি।
তবে একই ইউনিয়নে দুইজন কাজী নিয়োগ দেওয়া হয় কি না- এ প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি।
এ বিষয়ে তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খানের সরকারি মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
পরে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


