ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সিন্ডিকেটের কবলে পবা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস: চাঁদাবাজি রুখতে ‘কল্যাণ সমিতি’র চ্যালেঞ্জ

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মে ২, ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম
পবা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। ছবি : সংগৃহীত

​রাজশাহীর পবা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রির নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও সীমাহীন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি রাজস্ব ও নির্ধারিত পারিশ্রমিকের বাইরে প্রতিটি দলিলে অতিরিক্ত সাড়ে তিন হাজার টাকা ‘চাঁদা’ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি বন্ধের অঙ্গীকার নিয়ে পবায় আত্মপ্রকাশ করেছে ‘পবা দলিল লেখক কল্যাণ সমিতি’। সমিতির নেতারা চাঁদাবাজি বন্ধ ও জনদুর্ভোগ কমাতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দাখিল করেছেন।

​অনুসন্ধানে জানা যায়, পবা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিটি দলিল রেজিস্ট্রেশনের জন্য সরকারি খরচ ও লেখকের পারিশ্রমিক ছাড়াও ‘পবা উপজেলা দলিল লেখক সমিতি’র নামে বাড়তি সাড়ে তিন হাজার টাকা চাঁদা আদায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এই জুলুমের প্রতিবাদে গত ৮ এপ্রিল ১৯ জন সনদপ্রাপ্ত দলিল লেখক জেলা প্রশাসক, পুলিশ কমিশনার ও জেলা রেজিস্ট্রারসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানান। তবে প্রতিকার তো মিলছেই না, উল্টো প্রতিবাদী লেখকদের দাপ্তরিক রশিদ গায়েবসহ নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

​ভুক্তভোগী লেখকরা জানান, গত ২৯ মার্চ থেকে তাদের মাধ্যমে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের রশিদগুলো অফিস থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।

অফিসের স্টাফদের দাবি, রশিদগুলো পুরনো সমিতির নেতারা নিয়ে গেছেন। এতে জমি দাতা ও গ্রহীতারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

​সেবা নিতে আসা এক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার দলিলের মূল্য অনুযায়ী সরকারি রাজস্ব আসার কথা ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু আমার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। এই বাড়তি ১০ হাজার টাকা কোথায় গেল? কার পকেটে গেল? আমরা তো জিম্মি হয়ে আছি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দলিল লেখক জানান, কমিটির ৪-৫ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতে পুরো অফিস জিম্মি। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষমতা কারও নেই।

​এই অনিয়মের বিরুদ্ধে পাল্টা অবস্থান নিয়ে গত ২৯ এপ্রিল মহানগরীর কাশিয়াডাঙ্গা মোড়ে মোজাহার আলীকে আহ্বায়ক এবং রবিউল ইসলাম খোকনকে সদস্য সচিব করে ‘পবা দলিল লেখক কল্যাণ সমিতি’ গঠিত হয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।

নবগঠিত সমিতির সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম খোকন বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে আর কোনো চাঁদাবাজি হতে দেব না। জনহয়রানি বন্ধ করে সরকারি নিয়ম মেনে সেবা দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। যারা রশিদ আটকে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চাই।’

​অন্যদিকে, পবা দলিল লেখক সমিতির সভাপতি মো. আনারুল ইসলাম আবু ও সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান সবুজ চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তারা জানান, সদস্যদের কল্যাণের জন্য অর্থ জমা রাখা হয়। যারা সমিতির অন্তর্ভুক্ত নয়, তাদের বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ নেই। বিষয়টিকে তারা ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেন।

​সচেতন মহলের মতে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারাদেশে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন, সেখানে জনগণকে জিম্মি করে এমন কর্মকাণ্ড কাম্য নয়।

এ বিষয়ে উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার শাহীন আলী বলেন, ‘অফিসের রশিদ বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

​জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুর রকিব সিদ্দিক জানান, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো সিন্ডিকেট সহ্য করা হবে না। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

​তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে পুলিশ কমিশনার জিল্লুর রহমান এবং আরএমপি পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র গাজিউর রহমানকে একাধিকবার ফোন দিলেও তারা রিসিভ না করায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

পবা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আগত সেবাগ্রহীতাদের দাবি, হয়রানি ও বাড়তি খরচ ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেবা দেওয়ার দ্রুত পদক্ষেপ নিক কর্তৃপক্ষ।