কাপ্তাই হ্রদ-এর পানি কয়েক দিনের মধ্যে না কমানো হলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বোরো মৌসুমের ধান চাষসহ অন্যান্য আবাদ। এতে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো কৃষক। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নির্ধারিত সময়ে পানি না নামলে চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উৎপাদন অনেক কমে যেতে পারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিলাই বাজার, কেরনছড়ি, ধূপ্যাচর, দীঘলছড়ি, কুতুবদিয়া, মাছকাবা ছড়া, শুকনা ছড়া, সাক্রাছড়ি, বহলতলী ও ভালাছড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়—হ্রদের উঁচু অংশের কিছু জমিতে ধান রোপণ করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে থাকায় দ্বিতীয় স্তরের জমিগুলোতে চাষ শুরুই করা যায়নি। একই চিত্র দেখা গেছে হ্রদ তীরবর্তী অন্যান্য উপজেলাতেও।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাঠজুড়ে ইতোমধ্যে বীজতলা, জালা ও বীজবপনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু পানি দ্রুত না কমায় তারা প্রহর গুনছেন জমিতে নামার জন্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কৃষক জানান, গত বছর এ সময়ের মধ্যে পানি অনেক নিচে নেমে গিয়েছিল। তারা সংবাদে দেখেছেন, নির্বাচনের সময় যোগাযোগ সুবিধার জন্য পানি কিছুটা ধরে রাখা হয়েছিল—নির্বাচন শেষে দ্রুত কমানো হবে বলেও আশা করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও পানি প্রত্যাশিত হারে কমছে না।
একজন কৃষক বলেন, কাপ্তাই বাঁধের আশপাশের জলেভাসা জমিগুলোতে বছরে মাত্র একবারই চাষ করা যায়। ডিসেম্বর-জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির মধ্যে পানি না কমলে সময়মতো চাষ করা সম্ভব হয় না। জুন-জুলাইয়ে বর্ষা মৌসুমে আবার পানি বেড়ে গেলে পুরো মৌসুমই হাতছাড়া হয়ে যায়। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে কৃষকদের। তাদের প্রশ্ন—'সময়ে পানি না কমলে এই ক্ষতির দায় নেবে কে?'
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজেশ প্রসাদ রায় জানান, চলতি মৌসুমে ২৮০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও পানি দ্রুত না কমলে সর্বোচ্চ ৭৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ সম্ভব হতে পারে। এতে উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর আহাম্মদ বলেন, 'কাপ্তাই হ্রদের জলেভাসা জমিগুলোতে কৃষকরা বছরে একবারই চাষ করতে পারেন। সঠিক সময়ে পানি না কমালে বীজতলা ও জালা নষ্ট হয়ে যায়। এতে কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হন। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে—তাই প্রতি বছরের ন্যায় নির্দিষ্ট সময়ে পানি কমানো এবং বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।'
সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা বলেন, নদীর পাড় ও তীরবর্তী অংশ শুকিয়ে দিয়ে অন্তত নৌচলাচলের উপযোগী পানি রেখে বাকি পানি দ্রুত কমিয়ে ফেলা উচিত। এতে চাষযোগ্য জমিগুলো দ্রুত আবাদযোগ্য অবস্থায় ফিরে আসবে।
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপক জানান, নির্বাচনের আগে একটি গেট খোলা ছিল, বর্তমানে দুটি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পানির উচ্চতা ৯৩ ফুট এমএসএল (Mean Sea Level)। তিনি আরও জানান, কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে রাঙামাটির প্রায় ৫৪ হাজার একর জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে পানি ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষা করা একটি জটিল বিষয়।
স্থানীয়রা বিষয়টি সুদৃষ্টিতে দেখার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান-এর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের প্রত্যাশা—দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে কৃষকদের স্বপ্ন রক্ষা পাবে এবং বোরো মৌসুমে সম্ভাব্য ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন