মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রভাব এবার পড়েছে দেশের স্থানীয় বাজারেও। যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় অনেকে আগেভাগেই জ্বালানি সংগ্রহ করতে শুরু করেছেন। ফলে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল মজুত করার প্রবণতায় সিলেট নগরীর বেশ কিছু ফিলিং স্টেশন ইতোমধ্যে পেট্রোল ও অকটেনশূন্য হয়ে পড়েছে।
রোববার (৮ মার্চ) সকাল থেকেই সিলেট নগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ঝুলতে দেখা যায় হাতে লেখা ‘পেট্রোল নেই’ ও ‘অকটেন নেই’ লেখা পোস্টার ও ব্যানার। এতে করে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালক, ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক এবং গণপরিবহনের চালকরা।
এমন পরিস্থিতিতে তেলের খোঁজে অনেককে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ঘুরে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে দেখা গেছে। কেউ কেউ আবার গাড়ি নিয়েই বন্ধ পাম্পের সামনে বা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন তেল আসার আশায়। তবে পেট্রোল ও অকটেনের সংকট থাকলেও হাতে গোনা কয়েকটি স্টেশনে সিএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। ফলে সেসব পাম্পে দীর্ঘ যানবাহনের লাইন তৈরি হয়েছে।
সিলেট নগরীর অন্তত সাতটি স্পট ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনই কার্যত জনশূন্য। বিক্রয়কর্মীদের পরিবর্তে সেখানে কেবল নিরাপত্তাকর্মীদের বসে থাকতে দেখা গেছে। জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেক পাম্পের প্রবেশপথে আড়াআড়িভাবে দড়ি বা অস্থায়ী ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
একটি ফিলিং স্টেশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ‘সকাল থেকেই অনেক মানুষ তেলের জন্য আসছেন। কিন্তু আমাদের পাম্পে গতকাল রাতেই পেট্রোল ও অকটেন শেষ হয়ে গেছে। নতুন সরবরাহ কখন আসবে. সেটিও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তাই অনেককেই হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।’
বাইক নিয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করা বেসরকারি চাকরিজীবী হাসান আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সকালে অফিসে যাওয়ার আগে তেল নিতে এসেছিলাম। একটার পর একটা পাম্প ঘুরলাম, কোথাও পেট্রোল নেই। এখন কীভাবে অফিসে যাব, সেটাই বুঝতে পারছি না। এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখিনি।’
গাড়িতে তেল নিতে আসা ফয়ছল আলম বলেন, ‘শুনলাম, তেলের সংকট হতে পারে, তাই একটু আগেভাগে তেল নিতে বের হয়েছি। কিন্তু এসে দেখি, প্রায় সব পাম্পেই একই অবস্থা। যেগুলোতে সিএনজি আছে, সেখানে আবার বিশাল লাইন। যদি দ্রুত সরবরাহ না আসে, তাহলে শহরের যান চলাচলেও বড় সমস্যা তৈরি হবে।’
বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক বেসরকারি চাকরিজীবী দুর্জয় কবির শান্ত বলেন, ‘অনেক পাম্পে নাকি তেল আছে, কিন্তু তারা দিচ্ছে না—এমন কথাও শুনছি। অনেকে বলছেন, দাম বাড়লে তখন বিক্রি করবে। বিষয়টি সত্য কি না, আমরা সাধারণ মানুষ তো যাচাই করতে পারছি না। আবার কোথাও অভিযোগ করার মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থাও নেই। কে দেখবে, কে তদারকি করবে, সেটাও স্পষ্ট না।
যারা মনিটরিং করার কথা, তারা হয়তো অফিসের এসি কক্ষে বসে নির্দেশনা জারি করছেন। কিন্তু মাঠে তো কাউকে দেখা যাচ্ছে না। এখন যেহেতু আতঙ্কে মানুষ বেশি করে তেল নেওয়ার চেষ্টা করছে, আর পাম্পগুলোতেও সিন্ডিকেটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঠে একাধিক মনিটরিং টিম থাকা দরকার ছিল।
কোথাও অনিয়ম হলে যেন সাধারণ মানুষ সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করতে পারে এবং দ্রুত প্রতিকার পায়, সেজন্য একটি হটলাইন চালু করা প্রয়োজন। তাহলে অন্তত মানুষ বুঝতে পারবে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কেউ কাজ করছে।’
এ বিষয়ে পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, ‘আসলে এটি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয় নয়, বরং হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণেই সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে। অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল নিতে আসছেন। এতে কিছু পাম্পে মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আশা করছি খুব দ্রুতই নতুন সরবরাহ আসবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে। প্যানিক বায়িং বন্ধ হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে না।’
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যদি কোথাও কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তাহলে সেটি অবশ্যই তদন্ত করা উচিত। আমরা নিজেরাও চাই না কেউ সুযোগ নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করুক বা তেল মজুত করে রাখুক। সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি অভিযোগ গ্রহণের কোনো হটলাইন চালু করে এবং মাঠপর্যায়ে মনিটরিং আরও জোরদার করে, তাহলে সেটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ হবে। এতে যেমন অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হবে, তেমনি বাজারেও দ্রুত স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে।’
এদিকে হঠাৎ করে জ্বালানি সংকটের খবরে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যদি পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে পরিবহন ব্যবস্থা ও নিত্যদিনের চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক সরওয়ার আলম বলেন, ‘জ্বালানি তেলের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। মূলত হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছু ফিলিং স্টেশনে সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো পাম্প যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বা নির্ধারিত নিয়মের বাইরে কোনো অনিয়ম করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি মনিটরিং করা হচ্ছে।’
জেলা প্রশাসক আরও জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
-20260308144536.webp)

