ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের মধ্যেই নতুন ও ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। গোয়েন্দা সংস্থার চলমান তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থ-অস্ত্রের জোগানদাতা হিসেবে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ ওরফে ‘শাহীন চেয়ারম্যান’-এর নাম পাওয়া গেছে বলে একাধিক তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সূত্রগুলো জানায়, দীর্ঘদিন ধরে কেরানীগঞ্জে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত শাহীন চেয়ারম্যান এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছেন। শুধু পরিকল্পনাই নয়, হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে অর্থ, অস্ত্র ও লজিস্টিক সহায়তাও তার পক্ষ থেকেই এসেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, শাহীন চেয়ারম্যান একা নন; তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সহযোগিতায় ছিলেন আরও কয়েকজন ব্যক্তি। প্রাথমিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে।
এ ঘটনায় সন্দেহভাজনদের একটি তালিকা তৈরি করে কয়েকজনের ওপর নজরদারি জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এক তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি কোনো বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল এবং ভয় সৃষ্টি করে আধিপত্য বজায় রাখার প্রবণতা।’
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, হাদির ওপর হামলার পর হত্যাকারীদের ঢাকা থেকে সীমান্তের দিকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন গোপালগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবদুল হামিদ। এই অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য একাধিক স্থানে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
তদন্তে পাওয়া কললিস্ট ও যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হামলার আগে ও পরে হত্যাকারীদের সঙ্গে তার একাধিকবার যোগাযোগ হয়েছিল। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, নিরাপদ রুট ও আশ্রয়ের ব্যবস্থাও এই নেটওয়ার্ক থেকেই করা হয়েছিল।
কে এই শাহীন চেয়ারম্যান?
কেরানীগঞ্জের স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শাহীন আহমেদের উত্থান ছিল নাটকীয়। একসময় কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর ঘাটে ট্রলার থেকে চাঁদা তোলার কাজ করেছেন, আবার কিছুদিন বাসের কন্ডাক্টর হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। বড় ভাই ফারুক আহমেদ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকায় রাজনৈতিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
২০০৯ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তার ক্ষমতার বিস্তার শুরু হয়। একই সঙ্গে তিনি কেরানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। স্থানীয়দের দাবি, এর পর থেকেই কেরানীগঞ্জ কার্যত তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ১৭ বছরে শাহীন চেয়ারম্যান রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে জমি দখল, চাঁদাবাজি, বালু ভরাট, হাট-বাজার ইজারা, আবাসন প্রকল্প ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেন। তার অনুমতি ছাড়া এলাকায় জমি কেনাবেচা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে বলে দাবি করেন অনেকে।
একাধিক ভুক্তভোগী জানান, কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা, হামলা কিংবা এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার ঘটনা ঘটেছে। ভয় দেখিয়ে ও জোরপূর্বক জমি লিখে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করে আরও জানায়, সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে শাহীন চেয়ারম্যান আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এই রাজনৈতিক ছত্রছায়ার সুযোগে তিনি শিল্পাঞ্চল, হাউজিং প্রকল্প ও বালু ভরাটের নামে হাজার হাজার একর জমি দখল করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৪ সালে যেখানে শাহীন আহমেদের ঘোষিত সম্পদ ছিল তুলনামূলক সীমিত। সেখানে ২০২৪ সালের নির্বাচনের হলফনামায় তার ও স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ জমি, ফ্ল্যাট, নগদ অর্থ ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের তথ্য উঠে আসে।
স্থানীয়দের দাবি, কাগজে-কলমে যা দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তার সম্পদের পরিমাণ তার চেয়েও অনেক বেশি। দেশ-বিদেশে অঢেল সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কথাও শোনা যায়।
কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নে সরকারি খাসজমি, নদী ও খালের জমি, কৃষিজমি দখল করে শিল্পপার্ক ও আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে শাহীন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। বহু পরিবার জমি হারিয়ে গ্রামছাড়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তাদের বাড়ির চারপাশে দেয়াল তুলে চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা জমি বিক্রি করতে বাধ্য হন। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন ও প্রশাসনে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে তাদের অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনায় শাহীন চেয়ারম্যানের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ছিল। এতে তার ভাই শিপু আহমেদসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের একাধিক নেতাকর্মী যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি জানান, চেয়ারম্যান থাকাকালে শাহীন আহমেদ ও তার বাহিনীর ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেতেন না।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর শাহীন আহমেদ ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগী আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, হাদি হত্যাকাণ্ডসহ তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রমাণের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন