পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) সম্প্রতি প্রকাশিত ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক (জানুয়ারি) প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশের ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশের মধ্যে থাকবে। তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে এই প্রবৃদ্ধির পথে ঝুঁকি রয়েছে।
জিইডি প্রতিবেদনে বলা হয়, মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা নভেম্বরের ৮.২৯ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যমূল্যস্ফীতি ৭.৩৬ শতাংশ থেকে ৭.৭১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। খাবার বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশে রয়েছে।
চালের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, তবে চালের দাম এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি। নভেম্বরের ১২.২৬ শতাংশ থেকে ডিসেম্বরে চালের সার্বিক মূল্যস্ফীতি নেমে ১১.৯২ শতাংশ হয়েছে। মধ্যম মানের চালের মূল্যস্ফীতি ১০.৯৬ থেকে ১০.৪৮ শতাংশ, চিকন চালের ১৫.৪৩ থেকে ১৪.৮৪ শতাংশ এবং মোটা চালের ১১.০৪ থেকে ১০.৯২ শতাংশ। খাদ্যমূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান কমে ৪০.২৮ শতাংশ থেকে ৩৭.৩৪ শতাংশ। বিপরীতে, মাছ ও শুঁটকি মাছের অবদান বেড়ে ৪০.৭৭ থেকে ৪৩.৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
পেঁয়াজের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক থেকে ইতিবাচক হয়েছে, অন্যদিকে আলু মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের হ্রাসকারী পণ্য হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে, ফলে এ দুটির মধ্যে ব্যবধান আরও বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি ০.২০ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে, যেখানে মজুরি মূল্যস্ফীতি সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৮.০৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৪.৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ে ছিল ২.৫৮ শতাংশ। প্রাথমিক অনুমিত হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্থির মূল্যে সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৭২ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কৃষি খাত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ২.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ৩.৫৯ থেকে ৬.৯৭ শতাংশে এবং সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ২.৯৬ থেকে ৩.৬৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কৃষি খাতের জিডিপিতে অংশ কমে ৯.৮৪ শতাংশে, শিল্প খাতের অংশ বেড়ে ৩৮.৩৪ শতাংশে।
ব্যাংকিং খাতে, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে আমানতের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। নভেম্বর মাসে বছরওয়ারি হিসাবে আমানত প্রবৃদ্ধি ১০.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সরকারি খাতের ঋণ সম্প্রসারণ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে নভেম্বর মাসে ২৩.২৪ শতাংশে পৌঁছেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬.৫৮ শতাংশে রয়ে গেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা, যেখানে ডিসেম্বর মাসে আদায় ৩৬,১৯১ কোটি টাকা, যা মাসিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) চূড়ান্ত করা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকায়, যা মূল এডিপির তুলনায় কিছুটা কম। বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে পরিবেশ, বন ও পানি সম্পদ খাতে (২০.৩৬ শতাংশ) এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন খাতে (১২.৪০ শতাংশ)।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয়েছে—ডিসেম্বর মাসে মোট রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩.১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। রেমিট্যান্স প্রবাহও বৃদ্ধি পেয়ে ৩.২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। রপ্তানি আয় স্থিতিশীল, প্রতি মাসে প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে, যার প্রধান অবদান তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে। ডিসেম্বরে বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল, যা মুদ্রার মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমিয়েছে।
জিইডি প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ, সুশাসন, নীতিগত ধারাবাহিকতা, দক্ষতা ও প্রযুক্তি ভিত্তিক বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্বল্পমূল্যের শ্রম মডেল থেকে উচ্চমূল্যের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থানান্তরের জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ও স্মার্ট প্রযুক্তির সমন্বয় অপরিহার্য। এ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে গ্রাম পর্যায়ের উদ্যোগ এবং তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জিইডি আশা করছে, সম্ভাব্য ৫ শতাংশের প্রবৃদ্ধি এবং কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশ ২০২৬ সালে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগোবে।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন