আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে নিযুক্ত শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে সরকার।
নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ‘নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১’ অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে সামান্য অবহেলা বা গাফিলতির ক্ষেত্রেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
এ লক্ষ্যে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের কাছে একটি পরিপত্র পাঠানো হয়েছে। ওই পরিপত্রের ধারাবাহিকতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগও তাদের আওতাধীন সকল দপ্তর, অধিদপ্তর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনটির সব বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক শিক্ষক জাতীয় নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণে নির্বাচনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘নির্বাচন কর্মকর্তা’ হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং তারা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব সংস্থা—ইউজিসি, মাউশি, নায়েম, ব্যানবেইস, এনটিআরসিএ, এনসিটিবি, আইইডি—সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্বাচন সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে সজাগ থাকতে বলা হয়েছে।
কোন কাজগুলো ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে
‘নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১’ অনুযায়ী নিচের কাজগুলো অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে—
- নির্বাচনি দায়িত্ব গ্রহণে অনীহা বা অস্বীকৃতি
- দায়িত্ব পালনে ইচ্ছাকৃত অবহেলা বা শৈথিল্য
- কমিশন বা রিটার্নিং অফিসারের নির্দেশ অমান্য
- নির্বাচনি কাজে ভুল, বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা তথ্য প্রদান
- নির্বাচন সংক্রান্ত আইন বা বিধি ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন
আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে শাস্তিযোগ্য অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
কী ধরনের শাস্তি হতে পারে
নির্বাচনি দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নেওয়া হতে পারে একাধিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। এর মধ্যে রয়েছে—
- সাময়িক বরখাস্ত (সর্বোচ্চ দুই মাস)
- চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্ত
- পদাবনতি
- বাধ্যতামূলক অবসর
- পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত স্থগিত
এছাড়া প্রশাসনিক শাস্তির পাশাপাশি ফৌজদারি শাস্তিরও বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী—
- দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি বা বাধা দিলে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে
- কমিশনের আদেশ অমান্য করলে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা দুই হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে
কমিশনের বিশেষ ক্ষমতা
আইন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন চাইলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে পারবে। এমনকি তদন্ত চলাকালে কমিশন সরাসরি সাময়িক বরখাস্তের আদেশও দিতে পারে, যা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের আদেশ হিসেবে কার্যকর হবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের অধীনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষককে সততা, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো ধরনের শৈথিল্য বা গাফিলতি না দেখাতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।
সরকার মনে করে, একটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শুধু প্রশাসনিক কর্তব্য নয়, এটি একটি সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।




