বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)-তে ঈশা খাঁ হলের কিছু শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মাওলানা ভাসানী হলের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে কৃষি অনুষদের ৬১তম ব্যাচের পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের করিম ভবন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম হাসিবুল হাসান কৌশিক। তিনি কৃষি অনুষদের ৬১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী হাসিবুল হাসান কৌশিক জানিয়েছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণেই তিনি এই হামলার শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাকে যারা মারছে তারা বিগত সময়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ’২৪ সালের আন্দোলনে তারা মুক্তিযুদ্ধ কোটার পক্ষেও ছিল। এসবের প্রমাণও আমার কাছে আছে। যেহেতু আমি ছাত্রদল করি, ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য, দলীয় ভিন্নমত থাকতেই পারে। যেহেতু ওরা আগে ছাত্রলীগ করত, হয়তো সেই জেদ থেকেই আমাকে মেরেছে। আমি পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পর আমার ওপর ৪৫ থেকে ৫০ জন আক্রমণ করে। সেখানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা সবাই ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিল।’
কৌশিক আরও বলেন, ‘যারা নেতৃত্ব দিয়ে ঈশা খাঁ হল থেকে জুনিয়রদের নিয়ে এসেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল সুলেমান সানি। সে-ই প্রথম আমাকে আঘাত করে। সানি আমাকে পেছন থেকে মাথায় আঘাত করে। এছাড়া আবরার মুনতাসির, মাহিন হোসেন, নাইমুর রহমান দিগন্ত, নিশাত ও সাকিব আল হাসান-তারা সবাই নেতৃত্ব দিয়ে আমার ওপর এই হামলা চালায়। জুনিয়ররা তো আর ছাত্রলীগ করে না; সিনিয়ররা যা বুঝিয়েছে, তারা সেটাই বুঝে আমাকে মারতে আসে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ কেয়ার থেকে চিকিৎসা নিয়ে হলে বেড রেস্টে আছি।’
তবে কৌশিকের বক্তব্য অনুযায়ী অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঈশা খাঁ হলের অভিযুক্তরা। তাদের দাবি, কৌশিকের বক্তব্য অপপ্রচার ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অভিযুক্ত সুলেমান সানি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ঘটনার সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। আমারও পরীক্ষা ছিল এবং পরীক্ষা শেষে আসন্ন একটি ট্যুর নিয়ে আলোচনা করতে একজন শিক্ষকের চেম্বারে গিয়েছিলাম। ঘটনা সম্পর্কে পরে জেনেছি। গত বৃহস্পতিবার এগ্রিকালচার ফ্যাকাল্টির ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে কৌশিক আমাদের হলের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়েছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই সম্ভবত জুনিয়ররা তার সঙ্গে এ ঘটনার সৃষ্টি করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং আমি ঘটনাস্থলেও ছিলাম না।’
সানি আরও বলেন, ‘কৌশিক যে আমার নাম জড়িয়েছে, তার পেছনে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা কাজ করছে। সে আমার সঙ্গে ক্লাস প্রতিনিধি হওয়ার প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়েছিল, তাই সম্ভবত সেই ক্ষোভ থেকেই সে আমাকে দায়ী করছে। এছাড়া আমার বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলা হয়েছে, তাও সত্য নয়। আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই। আমরা ২০২৩ সালে প্রথম বর্ষে ছিলাম, ২০২৪ সালে দ্বিতীয় বর্ষে উঠি। ওই সময়ে আমরা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। আর আমরা যদি ছাত্রলীগ হয়ে থাকি, তাহলে কৌশিকও ছাত্রলীগ, কারণ আমরা একই লেভেলের। সুতরাং, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ অপপ্রচার।’
আরেক অভিযুক্ত সাকিব আল হাসান বলেন, ‘আমরা তো ঘটনাস্থলে উপস্থিতই ছিলাম না। প্রশাসন ও হল প্রভোস্টরা ছিলেন এবং তারা সব জানেন। করিম ভবনের কাছে যখন ঘটনা ঘটে, তখন আমরা কেউ সেখানে ছিলাম না। সুলেমান সানি, মাহিন হোসেন, দিগন্ত, নিশাত এবং আমিসহ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যেমন নিশাত বাকৃবি শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক; সে বগুড়ায় আছে, কারণ প্রধানমন্ত্রী সেখানে গিয়েছেন। আমরা রুমেই ছিলাম। সানির নামও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বলা হচ্ছে। এছাড়া কৌশিক একজন সন্ত্রাসী। সে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে বেড়ায়। আমাদের হলের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে কিছুদিন আগে সোহরাওয়ার্দী হলের পেছনে নিয়ে যায় ১০-১৫ জন মিলে। এখন একজন সন্ত্রাসীর পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কীভাবে অবস্থান নেয় বা সাংবাদিক হিসেবে আপনারা কী ভূমিকা পালন করেন, সেটাও দেখার বিষয়।’
এ ঘটনায় কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. আতিকুর রহমান ও সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এ এম শোয়াইব।
আহ্বায়ক মো. আতিকুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার শিকার শিক্ষার্থী প্রথমে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী, পরে ছাত্রদলের সদস্য। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল। পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পর কিছু উচ্ছৃঙ্খল ছেলে, যারা আগে ছাত্রলীগ করত এবং এখন ঈশা খাঁ হলে থাকে, তারা তার ওপর হামলা করেছে। হামলার কারণ হিসেবে আমরা যতদূর জানতে পেরেছি, কিছুদিন আগে ফ্যাকাল্টিতে একটি প্রোগ্রামকে কেন্দ্র করেই এ ঘটনার সূত্রপাত। এখানে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নেই। ছাত্রদল হিসেবে তাকে কেউ কিছু বলেনি। মূলত ফ্যাকাল্টি-সংক্রান্ত ঘটনার জেরে জুনিয়ররা তার সঙ্গে অসদাচরণ করেছে। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং প্রশাসনের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাই।’
সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এ এম শোয়াইব বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার কৃষি অনুষদের ৬৩ ও ৬৪ ব্যাচের রিসেপশন প্রোগ্রাম থেকেই এ ঘটনার সূত্রপাত। সেখানে আক্রান্ত শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের একটি ঘটনা ঘটেছে বলে শুনেছি। প্রশাসনের প্রতি আমাদের বার্তা- অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তদন্ত কমিটি গঠন করে সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিযুক্তদের ছাত্রলীগ হিসেবে সম্বোধন করার বিষয়ে বলব- যারা এখন প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে, তারা ২০২৫ সালে ভর্তি হয়েছে। ছাত্রলীগ বাংলাদেশ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চলে গেছে। যারা ওই সময়ের অনেক পরে ক্যাম্পাসে এসেছে, তারা কীভাবে ছাত্রলীগ হয়, তা বোধগম্য নয়। আমি কারও পক্ষে বা বিপক্ষে নই। যে অপরাধী, সে যেই হোক, প্রমাণের ভিত্তিতে তার সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. কাজী ফরহাদ কাদির বলেন, ‘বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য একটি তদন্ত কমিটি কাজ করবে এবং তদন্তের ভিত্তিতেই বিস্তারিত জানা যাবে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার যে প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, পূর্বের ঘটনার সঙ্গে এর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’



