টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের পরিস্থিতি বেশ নাজুক। এর মধ্যেই চলছে এইচএসসি পরীক্ষা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের কিছু পরীক্ষা স্থগিতও করা হয়েছে। তাহলে কেন হঠাৎ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে রাস্তায় নেমেছে শিক্ষার্থীরা?
ঘটনার সূত্রপাত গতকাল সোমবারের (১৩ জুলাই) পরীক্ষাকে ঘিরে। টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যেই পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ দাবি করেন শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল ও অতিরিক্ত কঠিন প্রশ্ন থাকার অভিযোগও উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করে। রাজশাহীতে শিক্ষাবোর্ড ঘেরাও, ময়মনসিংহে বিক্ষোভ, বরিশালসহ আরও বিভিন্ন জেলায় সমাবেশ দেখা গেছে।
রাজধানীর উত্তরায় ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক, ঢাকা–বরিশাল মহাসড়ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর এবং সায়েন্সল্যাব এলাকাতেও শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে।
শিক্ষার্থীরা কেন পদত্যাগ চাইছে?
১৩ জুলাই ৫৯ জেলায় পদার্থবিজ্ঞান (প্রথম পত্র), হিসাববিজ্ঞান (প্রথম পত্র) ও যুক্তিবিদ্যা (প্রথম পত্র) বিষয়ের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রায় ১৯ হাজার ৫৯২ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল।
আর শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন এখানেই— এমন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়া হলো কেন?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, পরীক্ষাকেন্দ্রের সামনে জলাবদ্ধতা, পথে হাঁটুসমান পানি, এমনকি অনেক শিক্ষার্থী পানিতে পড়ে গিয়ে আহতও হয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, এসব বাস্তবতা উপেক্ষা করে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেই তারা আন্দোলনে নেমেছেন।
বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দেয়, যেমন—‘দফা এক, দাবি এক—শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’, ‘আপস না সংগ্রাম—সংগ্রাম, সংগ্রাম’ ইত্যাদি। তাদের হাতে পরীক্ষা স্থগিত ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ডও দেখা যায়।
আইডিয়াল কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা রয়েছে—এটি মাঠপর্যায়ে যাচাই না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সহায়তা করার পরিবর্তে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত একেবারেই অযৌক্তিক।
পদত্যাগই কি সমাধান?
শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময় শিক্ষামন্ত্রীদের পদত্যাগের দাবি উঠেছে। যেমন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি জেট দুর্ঘটনার পর আন্দোলনের মুখে শিক্ষাসচিব সিদ্দিক জোবায়েরকে অপসারণ করা হয়।
আরও আগে, ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দীপালী সাহাসহ অন্তত ১০ জন নিহত হন—যা বাংলাদেশের শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বর্তমান আন্দোলন কিছুটা ভিন্ন। শিক্ষার্থীদের দাবি, জলাবদ্ধতার কারণে অনেকেই সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেনি। অনেককে হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে পরীক্ষা দিতে যেতে হয়েছে, ফলে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এসব বিবেচনায় না নিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে তারা অযৌক্তিক বলছে।
তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, পদত্যাগই একমাত্র সমাধান নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা মত উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, মাইলস্টোন স্কুলের এক শিক্ষার্থী আট দফা দাবি তুলে ধরেন-
১. পদত্যাগের পক্ষে নয়।
২. সিসিটিভি বা নিরাপত্তা কমানোর পক্ষে নয়।
৩. শিক্ষামন্ত্রীকে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।
৪. পরীক্ষার্থীদের ওপর ‘প্রহসনমূলক’ পরীক্ষা পদ্ধতি বন্ধ করতে হবে।
৫. সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন হলে পরীক্ষা স্থগিত করতে হবে।
৬. পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নের ভুল স্বীকার করে দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
৭. ভুল প্রশ্নের জন্য শিক্ষার্থীদের নম্বর নিশ্চিত করতে হবে।
৮. ভবিষ্যতে প্রশ্নপত্রের মান উন্নয়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে শিক্ষার্থীবান্ধব করতে হবে।

