বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর সেই পার্বণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সর্বজনীন উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ। নববর্ষের ভোরে রমনার বটমূল থেকে শুরু করে গ্রাম-বাংলার মেলা-সবখানেই যে সুরটি আমাদের শিহরিত করে, তা হলো আমাদের ঐতিহ্যবাহী গানগুলো। সময়ের বিবর্তনে বাদ্যযন্ত্র আর সুরের ধরনে পরিবর্তন এলেও বৈশাখের বিশেষ কিছু গান আজও তার স্বকীয়তা ও আবেগ নিয়ে টিকে আছে।
১. এসো হে বৈশাখ: বাঙালিয়ানা ও শুদ্ধতার প্রতীক
পহেলা বৈশাখের কথা উঠলেই সবার আগে মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমোঘ আহ্বান—‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’।
তাৎপর্য: জরাজীর্ণতা মুছে ফেলে নতুনকে আবাহন করার এই গানটি ছাড়া বাঙালির নববর্ষ যেন অসম্পূর্ণ। ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—এই গানটি আজও প্রতিটি বাঙালির শুদ্ধতার প্রতীক হয়ে আছে।
২. মেলায় যাই রে: উৎসবের প্রাণস্পন্দন
আশির দশকে ব্যান্ড লিজেন্ড মাকসুদুল হকের গাওয়া ‘মেলায় যাই রে’ গানটি বৈশাখের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবেগ: “নাগোর দোলার ছন্দে মেলায় যাই রে”-এই লাইনটি বাজলেই মনে পড়ে যায় রঙিন মেলা, মাটির পুতুল আর চিনি-বাতাসার ঘ্রাণ। আধুনিক প্রজন্মের কাছেও বৈশাখের আনন্দ মানেই এই গানটি। এটি কেবল একটি গান নয়, বরং বৈশাখী উৎসবের এক জীবন্ত দলিল।
৩. লোকজ সুরের মূর্ছনা: মাটির টানে ফেরা
বৈশাখের গানে পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি আর লালন গীতি এক অন্যরকম মাত্রা যোগ করে।
ঐতিহ্য: গ্রামীণ মেলাগুলোতে একতারা বা দোতারার সুরে যখন বেজে ওঠে মাটির গান, তখন তা শিকড়ের টানকে মনে করিয়ে দেয়। অনেক পুরনো হলেও এসব লোকজ গান আজও অমলিন, কারণ এগুলো মানুষের দৈনন্দিন সুখ-দুঃখের কথা বলে।
৪. আধুনিক বৈশাখী গান ও সমকালীন সুর
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বৈশাখ নিয়ে অনেক নতুন গান তৈরি হয়েছে। হাবিব ওয়াহিদ থেকে শুরু করে বর্তমানের অনেক তরুণ শিল্পী বৈশাখী গান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তবে সেগুলোও কোথাও না কোথাও পুরনো সেই লোকজ সুর বা ঐতিহ্যের ধার ধারছে।
৫. কেন এই গানগুলো আজও অমলিন?
এই গানগুলোর টিকে থাকার মূল কারণ হলো এগুলোর সাথে মিশে থাকা আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়। বছরের প্রথম দিনে যখন এই সুরগুলো কানে বাজে, তখন বাঙালি তার নিজের শেকড়কে নতুন করে খুঁজে পায়। শত ব্যস্ততা আর আধুনিকতার ভিড়েও এই গানগুলো আমাদের একসূত্রে গেঁথে রাখে।
পহেলা বৈশাখ মানেই নতুনত্বের জয়গান, আর সেই জয়গানে প্রাণ ভোমরা হয়ে থাকে আমাদের গানগুলো। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্লে-লিস্ট হয়তো বদলেছে, কিন্তু ‘এসো হে বৈশাখ’ বা ‘মেলায় যাই রে’ গানের আবেদন কোনোদিন ফুরোবার নয়। এই অমলিন সুরগুলোই প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমাদের সংস্কৃতিকে বহন করে নিয়ে যাবে।


