একটি আন্তর্জাতিক চ্যাট শোতে মার্কিন অভিনেত্রী শৈলিন উডলি জানান, তিনি প্রতিদিন এক চা-চামচ করে মাটি খান। তার এই বক্তব্য শুনে অনুষ্ঠানে উপস্থিত মানুষজন হতবাক হয়ে যান। মুহূর্তেই জন্ম নেয় নানা আলোচনা ও সমালোচনা। তবে আরও অবাক করে দিয়ে অভিনেত্রী শৈলিন বলেন, মাটি শরীর থেকে ভারী ধাতু বের করে দিতে সাহায্য করে এবং এটি শরীরের জন্য খুবই উপকারী।
এই ঘটনা ঘটার আগে এক ব্লগ পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, কাদামাটি শরীর শোষণ করে না; বরং শরীরের ভেতরে এক ধরনের ঋণাত্মক চার্জ তৈরি করে, যা ক্ষতিকর উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেগুলো বের করে দেয়।
তিনি জানান, এই ধারণা পেয়েছেন এক আফ্রিকান ট্যাক্সিচালকের কাছ থেকে। এমনকি তার কিছু বন্ধু নাকি কাদামাটি দিয়ে তৈরি টুথপেস্ট ব্যবহার করেন, যা থুতু ফেলার বদলে গিলে ফেলতে হয়।
এতক্ষণ উপরে যে লেখাগুলো আমরা পড়লাম, তা একেবারেই সত্য। প্রথমে শুনলে হয়তো যে কারও মাথা ঘুরে যেতে পারে, কারো মনে বিস্ময় জাগতে পারে- মানুষ কি সত্যিই মাটি খায়? চলুন, আজ জানি মাটি খাওয়া নিয়ে কিছু অজানা তথ্য।
মাটি খাওয়ার বৈজ্ঞানিক নাম
চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাটি বা কাদামাটি খাওয়াকে বলা হয় জিওফ্যাজি। কিংস কলেজ হাসপাতালের পুষ্টি ও খাদ্যতালিকা বিভাগের পরিচালক রিক উইলসন বলেন, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলে মাটি খাওয়ার চল রয়েছে। সাধারণত জিঙ্ক বা আয়রনের ঘাটতির কারণে মানুষ এমন অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে।

তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, উন্নত দেশগুলোতে পুষ্টির অভাব খুব একটা নেই। তাই ‘নেতিবাচক আইসোটোপ’ বা শরীর ডিটক্স করার ধারণা মূলত ভিত্তিহীন। তার ভাষায়, এগুলো সেলিব্রিটিদের কাছ থেকে ছড়িয়ে পড়া অর্থহীন স্বাস্থ্য-ফ্যাড।
মাটি খাওয়ার ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যমানের না হলে কাদামাটিতে সিসা বা আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতু থাকতে পারে, যা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ডা. সারাহ জার্ভিস বলেন, গর্ভবতী নারীদের শরীরে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ঘাটতি হলে কখনো কখনো মাটি বা কাদামাটি খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দেখা দিতে পারে। তবে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো জায়গায় স্বাস্থ্যকর খাবার সহজলভ্য হওয়ায় এই অভ্যাসের কোনো প্রয়োজন নেই।
কাচ চিবানো এক যুবকের গল্প
২০১২ সালে ৩২ বছর বয়সী এক যুবক চিকিৎসকের কাছে এসে জানান, তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে কাচ চিবিয়ে খাচ্ছেন। কাচ না খেলে তার অস্থির লাগে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।
এমআরআই পরীক্ষায় দেখা যায়, তার মস্তিষ্কে কিছু গঠনগত সমস্যা রয়েছে।
চিকিৎসকেরা জানান, এই সমস্যার কারণেই তাঁর এমন অদ্ভুত আচরণ তৈরি হয়েছে। একে বলা হয় অখাদ্য খাওয়ার রোগ।
পিকা কী?
এই ধরনের রোগের নাম পিকা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পিকা বলতে এমন একটি মানসিক ও শারীরিক অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে মানুষ নিয়মিতভাবে অখাদ্য বস্তু খেতে শুরু করে। এসব জিনিসের কোনো পুষ্টিগুণ নেই এবং দীর্ঘমেয়াদে এগুলো মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
‘পিকা’ শব্দটি এসেছে লাতিন পিকা পিকা থেকে, যা এক ধরনের ম্যাগপাই পাখির নাম। এই পাখিরা সামনে যা পায়, তাই খাওয়ার চেষ্টা করে। মানুষের এই অদ্ভুত স্বভাবের সঙ্গে মিল রেখেই রোগটির এমন নামকরণ।
পিকা রোগীরা কী কী খায়
পিকা রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা মাটি, কাদা, চক, কাগজ, সাবান, শ্যাম্পু, কয়েন, পেনসিল, কাঠকয়লা এমনকি পোড়া দিয়াশলাইও খেতে পারে। কী খাওয়া হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে এসব অভ্যাসের আলাদা বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। মাটি খাওয়াকে জিওফ্যাজি, বরফ চিবোনোকে প্যাগোফ্যাজি এবং পোড়া দিয়াশলাই খাওয়াকে কটোপাইরিওফ্যাজি বলা হয়।
শিশু ও সংস্কৃতির পার্থক্য
ছোট শিশুদের মুখে বিভিন্ন জিনিস দেওয়া স্বাভাবিক আচরণ। এটি তাদের শেখার প্রক্রিয়ার অংশ। তবে যদি কোনো ব্যক্তি এক মাসের বেশি সময় ধরে বয়স ও সংস্কৃতির সঙ্গে বেমানানভাবে অখাদ্য খেতে থাকে, তখনই একে পিকা রোগ হিসেবে ধরা হয়।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের কিছু দেশে মাটি খাওয়ার সাংস্কৃতিক চর্চা রয়েছে। সিলেট অঞ্চলের কিছু এলাকায় এখনো ‘ছিকর’ নামে মাটির তৈরি বিস্কুট খাওয়া হয়। এটি ঐতিহ্য হিসেবে দেখা হয়, রোগ হিসেবে নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ মাস থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে পিকা বেশি দেখা যায়। গর্ভবতী নারীরাও এই রোগে তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রান্ত হন।
২০১৮ সালের এক সুইস গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ১০ শতাংশ শিশুর মধ্যে পিকার লক্ষণ রয়েছে। অন্যদিকে, ২০১৬ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিস বলছে, প্রায় ২৮ শতাংশ গর্ভবতী নারী জীবনের কোনো এক সময়ে এই সমস্যায় ভুগেছেন।
কেন হয় পিকা রোগ
পিকার নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ নেই। তবে আয়রন বা জিঙ্কের ঘাটতি, রক্তশূন্যতা, চরম দারিদ্র্য, অবহেলা, মানসিক চাপ, শৈশবের ট্রমা এবং মস্তিষ্কের গঠনগত সমস্যা- সবকিছুই এই রোগের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
পিকা শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও এটি প্রাণঘাতী হতে পারে। অখাদ্য বস্তু অন্ত্রে জমে ব্লক তৈরি করতে পারে, অন্ত্র ফুটো হয়ে যেতে পারে কিংবা বিষক্রিয়া ঘটতে পারে। মাটি বা কাদা থেকে শরীরে মারাত্মক জীবাণু ও পরজীবী ঢুকতে পারে। দীর্ঘদিন এই অভ্যাস চলতে থাকলে ভয়ংকর অপুষ্টিও দেখা দেয়।
২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইথিওপিয়ায় গর্ভাবস্থায় মাটি খাওয়া নারীদের মধ্যে মারাত্মক কৃমি ও পরজীবী সংক্রমণ দেখা দিয়েছে।
চিকিৎসা ও করণীয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লজ্জা পেয়ে বিষয়টি গোপন রাখা উচিত নয়। পিকার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। চিকিৎসার সময় প্রথমে অখাদ্য বস্তু রোগীর আশপাশ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর শারীরিক ও মানসিক কারণ যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার, সাপ্লিমেন্ট ও মনোপরামর্শ দেওয়া হয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন