১৯৮২ সালে যুক্তরাজ্যের সারে অঞ্চলের ব্লেচিংলি গ্রামে বসবাসকারী ডেভিড মার্টিন নিজের বাড়ির চিমনি পরিষ্কার করার সময় এক অদ্ভুত ও চমকপ্রদ আবিষ্কারের মুখোমুখি হন। চিমনির ভেতর আটকে থাকা একটি বাহক পায়রার কঙ্কাল পাওয়া যায়, যার পায়ের সঙ্গে বাঁধা ছিল একটি ছোট লাল রঙের ধাতব ক্যানিস্টার। ক্যানিস্টারের ভেতরে ছিল একটি এনক্রিপ্ট করা বার্তা, যা দেখে ধারণা করা হয় এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কোনো গোপন সামরিক যোগাযোগ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাজ্যে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গঠিত হয়েছিল, যার নাম ছিল ‘জাতীয় পায়রা পরিষেবা’। যুদ্ধের সময় যখন রেডিও যোগাযোগ ঝুঁকিপূর্ণ, অনিরাপদ অথবা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ত, তখন এই বাহক পায়রাগুলোই হয়ে উঠত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বার্তাবাহক।
এই পরিষেবার মাধ্যমে যুদ্ধকালীন সময়ে দুই লাখ পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি পায়রা বার্তা বহনের কাজে ব্যবহৃত হয়। তাদের অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে সামরিক সংঘাতে প্রাণীদের জন্য সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে পরিচিত ডিকিন পদক প্রদান করা হয় ষাটটিরও বেশি প্রাণীকে, যার মধ্যে বত্রিশটিই ছিল বাহক পায়রা।
এই পায়রাগুলোর সাহসিকতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো উইঙ্কি নামের একটি বাহক পায়রার গল্প। ১৯৪২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি নরওয়ে থেকে যুক্তরাজ্যে ফেরার পথে একটি বোমারু বিমান শত্রুপক্ষের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বরফঠান্ডা সমুদ্রে বিধ্বস্ত হয়। বিমানটির ক্রুরা কোনোভাবেই নিজেদের অবস্থান জানাতে পারছিল না। সেই মুহূর্তে তারা শেষ ভরসা হিসেবে ছেড়ে দেয় উইঙ্কিকে। উইঙ্কি কোনো লিখিত বার্তা বহন করছিল না, কিন্তু প্রায় একশ বিশ মাইল উড়ে নিজের ঘাঁটিতে ফিরে আসে।
উইঙ্কি তেলে ভেজা অবস্থায় ফিরে এলে তার মালিক কর্তৃপক্ষকে খবর দেন। পায়রাটির উড়ে আসতে যে সময় লেগেছিল এবং আবহাওয়ার অবস্থা বিশ্লেষণ করে কর্তৃপক্ষ অনুমান করতে সক্ষম হয় বিমানটি কোথায় বিধ্বস্ত হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ক্রুদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এই অসাধারণ অবদানের জন্য উইঙ্কিকে ডিকিন পদকে ভূষিত করা হয়।
ডেভিড মার্টিনের চিমনিতে পাওয়া পায়রাটির পায়ে বাঁধা লাল ক্যানিস্টারটি নিশ্চিত করে যে এটি ছিল মিত্র বাহিনীর একটি পায়রা। পায়রাটির পায়ে থাকা অ্যালুমিনিয়ামের আংটি থেকে জানা যায়, পাখিটির জন্ম হয়েছিল ১৯৪০ সালে। তবে এর বেশি তথ্য নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, পায়রাটি ইউরোপের নাৎসি-অধিকৃত কোনো অঞ্চল থেকে উড়ে এসে ক্লান্ত অবস্থায় চিমনিতে আশ্রয় নিতে গিয়ে সেখানেই মারা যায়।
বার্তাটির নিচে স্বাক্ষর ছিল ‘সার্জেন্ট ডব্লিউ স্টট’ নামের সংক্ষিপ্ত রূপে। এখানে ‘সার্জেন্ট’ শব্দটির পুরোনো বানান ব্যবহার করা হয়েছিল, যা একসময় সামরিক বাহিনীতে প্রচলিত ছিল। বার্তায় পায়রার পরিচয়সংক্রান্ত দুটি আলাদা নিবন্ধন নম্বরও লেখা ছিল, যা জাতীয় রেসিং পায়রা ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়। তবে কোন নিবন্ধনের পায়রাটি চিমনিতে পাওয়া গিয়েছিল, তা আজও স্পষ্ট নয়।
অনেকে দাবি করেছেন, তারা এই রহস্যময় বার্তার পাঠোদ্ধার করতে পেরেছেন। ২০১২ সালে একজন কানাডীয় অপেশাদার কোড বিশ্লেষক বলেন, তিনি মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই বার্তাটি বুঝতে সক্ষম হয়েছেন।
তার দাবি অনুযায়ী, বার্তাটি ছিল সংক্ষিপ্ত সামরিক নির্দেশ ও পর্যবেক্ষণের সমষ্টি, যেখানে শত্রু বাহিনীর অস্ত্র, ঘাঁটি এবং অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ ছিল।
তিনি আরও বলেন, বার্তাটি লিখেছিলেন একজন ব্রিটিশ সার্জেন্ট, যিনি নরম্যান্ডিতে কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত হন।
তবে এই দাবিকে দ্রুতই প্রত্যাখ্যান করেন সরকারি বিশেষজ্ঞরা ও ইতিহাসবিদরা। তাদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পুরোনো কোড ব্যবহার করার ধারণা অবাস্তব এবং নিরাপত্তাহীন।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায়, ওই অপেশাদার বিশ্লেষক কেবল অক্ষরের সমষ্টিকে নিজের মতো করে অর্থ দিয়েছেন, যা কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে নয়।
সরকারি যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বার্তাটি সম্ভবত একবার ব্যবহারযোগ্য বিশেষ সাইফার পদ্ধতিতে এনক্রিপ্ট করা হয়েছিল। এই ধরনের বার্তা ভাংতে হলে নির্দিষ্ট কোডবই এবং এনক্রিপশনের বিস্তারিত জানা আবশ্যক। সেই তথ্যগুলো অনুপস্থিত থাকায় বার্তাটির প্রকৃত অর্থ উদ্ধার করা আজ কার্যত অসম্ভব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে বহু দশক আগে, কিন্তু এই বাহক পায়রা ও তার বহন করা বার্তাটি আজও ইতিহাসের এক নীরব প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রয়ে গেছে। একটি চিমনির ভেতর আটকে থাকা কঙ্কাল, একটি লাল ক্যানিস্টার আর কিছু অর্থহীন মনে হওয়া অক্ষর, যা হয়তো একসময় যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত বহন করেছিল। যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু তার সব গল্প আজও উন্মোচিত হয়নি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন