শীতকাল মানেই বাতাসে ভেসে আসে আলোর খোঁজের আনন্দ। কিন্তু তাতেও কিছু বিশেষ রীতি আছে, যা প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের হৃদয়কে উষ্ণ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মিসলেটোর নিচে চুমু খাওয়ার প্রথা। ছোট, ডিম্বাকৃতি চিরসবুজ পাতা ও সাদা মোমের মতো বেরি যুক্ত এই উদ্ভিদটির গল্প কেবল প্রেমের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়; এর উৎপত্তি ও ব্যবহার ছুঁয়ে গেছে প্রাচীন ধর্ম, ঋতুবিজ্ঞান, উর্বরতা ও রূপকের জগৎ।
পাখির বিষ্ঠা থেকে উৎপত্তি
মিসলেটো নামে পরিচিত এই উদ্ভিদটির নাম এসেছে অদ্ভুত এক উৎস থেকে। অ্যাংলো-স্যাক্সন শব্দ ‘মিস্টেল’ অর্থাৎ কুয়াশা এবং ‘ট্যান’ অর্থাৎ ঢাল বা লাঠি থেকে গঠিত। ব্রিটিশ অভিধানকার সুসি ডেন্ট বলেন, মিসলেটোর আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় ‘ঢালে পাখির বিষ্ঠা’।
কেন এমন অদ্ভুত নাম? কারণ পাখিরা উদ্ভিদের বেরি খেয়ে বীজ ছড়িয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় এন্ডোজুচোরি। বেরি খাওয়া পাখিরা বীজ অন্য গাছে পৌঁছে দেয়, যেখানে নতুন মিসলেটো জন্ম নিতে পারে। এমআইটি-এর অধ্যাপক ট্রিস্ট্রাম সিডলার বলেন, ‘যে বীজ মূল গাছের কাছাকাছি পড়ে তা অঙ্কুরিত হলেও রোগের কারণে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তাই দূরে ছড়িয়ে পড়া বীজই প্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখে।’

শীতকাল ও প্রাচীন সংস্কৃতি
প্রাচীন ইউরোপে শীতকাল ছিল মানুষের জীবনে বিশেষ সময়। নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক বেটিনা আর্নল্ড বলেন, ‘শীতকালীন অয়নকাল মানুষের কাছে পুনর্জীবনের প্রতীক। দিন বাড়তে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে তারা আশা দেখতো, জীবন ফিরে আসে।’
এ থেকেই ইউরোপজুড়ে ধারণা প্রচলন আছে, চিরসবুজ মিসলেটোই মৃত্যুর পরে জীবনের রূপক।
প্রথম শতাব্দীর রোমান লেখক প্লিনি দ্য এল্ডার মিসলেটোর ব্যবহার উল্লেখ করেছেন। ড্রুইডরা লৌহযুগের গল অঞ্চলে বিশেষ ওক গাছে মিসলেটো কেটে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করতেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, এটি প্রাণীদের উর্বরতা বাড়ায় এবং বিষকে প্রতিহত করে।
খ্রিস্টীয় সময়ে মিসলেটো শীতকালীন উৎসবের অংশ হিসেবে প্রবেশ করে। রোমানদের স্যাটার্নালিয়া উৎসব থেকে চিরসবুজ গাছ, পুষ্পস্তবক ও মালা দিয়ে ঘর সাজানোর রীতি খ্রিস্টীয় যিশু উৎসবে স্থান পায়।
মিথ ও প্রেমের গল্প
নর্স পুরাণে বালদুরের গল্পে মিসলেটোর অদ্ভুত শক্তির চিহ্ন দেখা যায়। আলোর দেবতা বালদুরকে মিসলেটো ছাড়া অন্য সবকিছুর থেকে অজেয় করে তোলা হয়েছিল। কিন্তু প্রতারক লোকি বালদুরকে হত্যা করার জন্য মিসলেটো দিয়ে তৈরি তীর ব্যবহার করে। পরবর্তী সংস্করণে বালদুরের মৃত্যুর পরে ফ্রিগের অশ্রু মিসলেটোর সাদা বেরিতে পরিণত হয়, যা ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
-20251217132817.png)
চুমুর আদি রীতি
আজ আমরা মিসলেটোর নিচে চুমু খাওয়ার রীতিকে মজার, রোমান্টিক আঙ্গিকে দেখি। কিন্তু এর প্রাচীনতম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় ১৭৮৪ সালের মিউজিক্যাল কমেডি টু ফর ওয়ান-এ। গানটিতে বলা হয়েছে, ‘কি সৌভাগ্য তোমাকে পাঠিয়েছে, আর মিসলেটোর নিচে চুমু খাও।’
ডেন্ট লেখেন, ‘একটি সামান্য স্ক্যাটোলজিক্যাল শুরু থেকে... মিসলেটোর গল্প সুন্দর কিছুতে বিকশিত হয়েছে।’ সত্যিই, আজকের এই রীতি প্রাচীনকাল থেকে ধারাবাহিক হয়ে আধুনিক উৎসব ও প্রেমের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
মিসলেটো কেবল একটি উদ্ভিদ নয়; এটি ঋতু, উর্বরতা, পুনর্জন্ম ও প্রেমের মিলনের রূপক। শীতের রাতে মোমবাতির আলোয় এর সাদা বেরির সৌন্দর্য এবং নিচে চুমুর রোমান্স আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিছু গল্প সত্যিই সময়ের সীমানা অতিক্রম করে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন