× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রূপালী প্রতিবেদক

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম

বদলে যাওয়া বেশরগাতি, লতিফ মাস্টার ফাউন্ডেশনের দুই দশকের যাত্রা

রূপালী প্রতিবেদক

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

বাগেরহাটের নিভৃত পল্লী বেশরগাতি থেকে শুরু হওয়া এক মানবিক বিপ্লবের নাম ‘লতিফ মাস্টার ফাউন্ডেশন’। একজন আদর্শ শিক্ষক কেবল পাঠদানই করেন না, বরং সমাজ পরিবর্তনের বীজ বুনে যান তারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি এই প্রতিষ্ঠান। ২০০৩ সালে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ মো. লতিফুর রহমানের হাত ধরে যে ক্ষুদ্র শিক্ষাবৃত্তির যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তার সুযোগ্য সন্তানদের নিরলস পরিশ্রমে তা রূপ নিয়েছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞে।

বেশরগাতি গ্রামটি এখন আর কেবল একটি সাধারণ গ্রাম নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে মানবিকতা ও স্বাবলম্বিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দেশের সাবেক সচিব বড় ভাই এবং প্রবাসী ছোট ভাই এই দুই সহোদরের শেকড়ের প্রতি মমত্ববোধ কীভাবে একটি গোটা জনপদকে বদলে দিতে পারে, লতিফ মাস্টার ফাউন্ডেশন তার এক জীবন্ত প্রমাণ। প্রখ্যাত শিক্ষক মো. লতিফুর রহমানের আদর্শকে অক্ষয় করে রাখতে তার দুই সন্তান বর্তমান সরকারের সাবেক সচিব ড. মো. ফরিদুল ইসলাম ও প্রবাসী সিপিএ মো. রফিকুল ইসলাম জগলু হাত ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি এখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক নিরাপত্তার এক বিশাল আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।

বেশরগাতি গ্রামে প্রবেশ করলেই এখন চোখে পড়ে এক কর্মচঞ্চল পরিবর্তনের ছবি। লতিফ মাস্টার ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মো. বোরহান উদ্দিন প্রতিষ্ঠানের শুরু সম্পর্কে বলেন, শুরুতে আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল কেবল মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা। কিন্তু আমরা যখন দেখলাম এলাকার মানুষের আরও নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে, তখন সেই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য আমরা একে একে সাতটি অঙ্গসংগঠন গড়ে তুলি। বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং কারিগরি শিক্ষার মতো জরুরি সেবাগুলো আমরা দিয়ে আসছি। আমাদের এই কাজ এখন আর শুধু বাগেরহাটেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের যেকোনো দুর্যোগে আমাদের স্বেচ্ছাসেবক দল সরাসরি অর্থ ও ত্রাণ সহায়তা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এমনকি দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসেও আমরা নিয়মিত কাজ করছি।

সংগঠনটি চ্যারিটি অর্গানাইজেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে ‘উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রম’ বা উসেকা (ইউএসইকেএ) নামে একটি আলাদা সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বাংলাদেশ সরকারের এনজিও বিষয়ক ব্যুরো থেকে নিবন্ধিত। এর মাধ্যমে ত্রাণ সহায়তা থেকে শুরু করে করোনাকালীন অক্সিজেন ও খাদ্য সহায়তা এবং সিডর-আইলার মতো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

শিক্ষা খাতে এই বিশাল পরিবর্তনের সুফল এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। লতিফ মাস্টার ফাউন্ডেশনের প্রকল্প পরিচালক মো. অলিউল্লাহ জানান, বর্তমানে ২০২৫ সালে গোল্ডেন এ প্লাস প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি মাসে বৃত্তি প্রদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

এই বৃত্তি সুবিধা পেয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সাহস পাচ্ছে মোসাম্মাৎ খাদিজাতুল কুবরা। এই সুবিধাভোগী মেধাবী ছাত্রী কৃতজ্ঞচিত্তে বলে, আমি যখন গোল্ডেন এ প্লাস পেলাম, তখন লতিফ মাস্টার ফাউন্ডেশন আমার পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসে। বর্তমানে তারা আমাকে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে বৃত্তি দিচ্ছে। এই সহায়তার কারণে আমার পড়াশোনায় অনেক উপকার হচ্ছে। আপনাদের এই অনুপ্রেরণা ও মানবিক কাজগুলো আমাকে পড়াশোনায় আরও বেশি মনোযোগী হতে সাহায্য করছে।

কেবল সাধারণ শিক্ষা নয়, এই অঞ্চলের বেকারত্ব দূর করতে কারিগরি শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন দুই ভাই। গ্রামের যুবকদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘বাগেরহাট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট’। এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মো. ওলিউজ্জামান মিনা বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, শুধু পুথিগত বিদ্যা দিয়ে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয়। তাই হাতে-কলমে কাজ শেখার জন্য বাগেরহাট ডিসি অফিসের সামনে একটি আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। অচিরেই আমরা বড় পরিসরে কারিগরি শিক্ষা প্রদান শুরু করতে পারব। এখান থেকে কাজ শিখে যুবসমাজ যখন দক্ষ হয়ে উঠবে, তখন তারা আর দেশের বোঝা থাকবে না, বরং সম্পদে পরিণত হবে। বর্তমানে এখানে টেইলারিং, ড্রাইভিং, কম্পিউটার অপারেশন, গ্রাফিক্স ডিজাইন এবং ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আমাদের মূল কথা জন্মভূমি বাংলাদেশ, কর্মভূমি বিশ্বময়।

নারীদের স্বাবলম্বী করতে কাজ করছে ফাউন্ডেশনের বিশেষ ট্রেনিং উইং। গ্রামীণ নারীরা যাতে ঘরে বসেই আয়ের পথ তৈরি করতে পারেন, সেজন্য তাদের ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

প্রশিক্ষক রোকাইয়া পারভীন সুমনা বলেন, আমরা প্রশিক্ষণার্থীদের ৫৪ দিনের একটি নিবিড় কোর্স করাই। ব্লক, বাটিক, স্ক্রিন প্রিন্ট এবং প্যাচওয়ার্কের মতো কাজ শেখানোর পাশাপাশি একজন উদ্যোক্তা হিসেবে কীভাবে পণ্য বিক্রি করতে হবে, সেই পথও আমরা দেখিয়ে দিই। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক নারী আজ সফল উদ্যোক্তা হয়েছেন।

প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে লতিফ মাস্টার ফাউন্ডেশন স্থাপন করেছে আধুনিক কেন্দ্র। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ডা. প্রদীপ কুমার বকসী বলেন, প্রতি শনিবার এখানে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও সেবা দেন। গত কয়েক বছরে আমরা প্রায় ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষকে বিনামূল্যে সেবা দিয়েছি। অনেক মানুষ, যাদের শহরে গিয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখানো সম্ভব নয়, তারা এখন বাড়ির দোরগোড়ায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা পাচ্ছেন। এটি এখানকার মানুষের স্বাস্থ্য সূচকের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে।

সাংস্কৃতিক জাগরণ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কাজ করছে এই প্রতিষ্ঠান। লতিফ মাস্টার পাবলিক লাইব্রেরির সভাপতি মো. সালমান বলেন, আমাদের এই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম এখন আর শুধু সমাজসেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তরুণ প্রজন্মকে মাদকের মরণ নেশা থেকে দূরে রাখতে এবং সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে ২০২৫ সাল থেকে আমরা 'বাগেরহাট শিল্প সাংস্কৃতিক সংস্থা' নামে একটি নতুন যাত্রা শুরু করেছি। কর্তৃপক্ষের দিকনির্দেশনায় আমরা একটি মাদকমুক্ত ও সংস্কৃতিমনা সমাজ গড়ে তুলতে চাই।

বর্তমানে বেশরগাতি গ্রামে ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে বেশ কিছু বড় প্রকল্প দৃশ্যমান হয়েছে, যা এলাকার চেহারা বদলে দিয়েছে। দৃষ্টিনন্দন ‘বায়তুল লতিফ জামে মসজিদ’, অসহায় শিশু ও প্রবীণদের আশ্রয়কেন্দ্র ‘স্বপ্ননীড় এতিম ও বৃদ্ধাবাস’, ‘লতিফ মাস্টার পাবলিক লাইব্রেরি’, তরুণদের জন্য ‘রকেট স্পোর্টিং ক্লাব’ এবং খামারিদের সহায়তায় ‘বেশরগাতি এগ্রো ফার্ম’। ভবিষ্যতে এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ মিনি স্টেডিয়াম, কওমি-আলিয়া ও হেফজ শাখার সমন্বয়ে একটি আধুনিক মাদ্রাসা, একটি গার্লস স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার, একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল এবং একটি দুগ্ধ ফ্যাক্টরি নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

বেশরগাতি গ্রামের এই গল্পটি কেবল পরিবর্তনের নয়; এটি একটি পারিবারিক প্রতিশ্রুতির গল্প। সাবেক সচিব ড. মো. ফরিদুল ইসলাম এবং প্রবাসী রফিকুল ইসলাম জগলু তাদের বাবার স্মৃতিকে কেবল পাথরে খোদাই করে রাখেননি, বরং সেই স্মৃতিকে জীবন্ত করে তুলেছেন হাজারো মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পদ কীভাবে দেশ গড়ার কাজে লাগানো যায়, তার এক অনন্য মডেল আজ বেশরগাতি গ্রাম। সদিচ্ছা আর শেকড়ের প্রতি টান থাকলে যে একটি গোটা এলাকাকে আলোকিত গ্রামে রূপান্তর করা সম্ভব লতিফ মাস্টার ফাউন্ডেশন আজ তার বড় প্রমাণ।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!