× UCB Sticker Card
সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রূপালী ফিচার

প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম

মানুষের হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক ও রক্তে যেভাবে পৌঁছে যাচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

রূপালী ফিচার

প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

প্লাস্টিক দূষণ এখন আর শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। প্রতিদিন আমরা যে খাবার খাই, পানি পান করি কিংবা শ্বাস নিই, তার মাধ্যমেই শরীরে প্রবেশ করছে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা—মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক। গবেষকদের মতে, এসব ক্ষুদ্র কণা ইতোমধ্যে মানুষের রক্ত, মস্তিষ্ক, বুকের দুধ, এমনকি হৃদপিণ্ডের ধমনী ও অন্যান্য অঙ্গেও শনাক্ত হয়েছে। এমনকি যে টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করি, সেই টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারের অনেক টুথপেস্টেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে। এমনকি শিশুদের জন্য তৈরি কিছু টুথপেস্টেও এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক কী?

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো প্লাস্টিকের এমন ক্ষুদ্র কণা, যার আকার সাধারণত ১ মাইক্রোমিটার থেকে ৫ মিলিমিটার পর্যন্ত। অন্যদিকে, ন্যানোপ্লাস্টিক আরও ছোট—১ মাইক্রোমিটারেরও কম। বড় প্লাস্টিক বর্জ্য দীর্ঘ সময় ধরে ভেঙে ভেঙে এসব ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। খালি চোখে ন্যানোপ্লাস্টিক দেখা যায় না, আর বেশিরভাগ মাইক্রোপ্লাস্টিকও অদৃশ্য।

বর্তমানে এসব কণা মহাসাগর, নদী, মাটি, বাতাস, খাদ্য ও পানীয়—প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিনই মানুষ কোনো না কোনোভাবে এর সংস্পর্শে আসছে।

কীভাবে শরীরে প্রবেশ করে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবার, পানীয় ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমেই মূলত মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করে।

ট্যাপের পানি ও বোতলজাত পানি, সামুদ্রিক মাছ, লবণ এবং বিভিন্ন প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারে এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্লাস্টিকের পাত্র ও মোড়ক থেকেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাবারে মিশে যেতে পারে। এ ছাড়া বাতাসে ভাসমান অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লাস্টিক কখনো পুরোপুরি বিলীন হয় না; বরং সময়ের সঙ্গে আরও ছোট ছোট কণায় ভেঙে যায়। ফলে পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে এবং এড়িয়ে চলাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

হৃদপিণ্ডের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও বিজ্ঞানীরা উদ্বেগজনক কিছু তথ্য পেয়েছেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ বাড়ার সঙ্গে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে ঠিক কী প্রক্রিয়ায় এই ক্ষতি হয়, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

গবেষণাগারে দেখা গেছে, শরীরের রোগপ্রতিরোধকারী নিউট্রোফিল কোষ মাইক্রোপ্লাস্টিককে বহিরাগত আক্রমণকারী হিসেবে শনাক্ত করে। কিন্তু এসব কণা ধ্বংস করতে না পেরে কোষগুলো আত্মবিধ্বংসী প্রক্রিয়ায় চলে যায়। এতে ডিএনএ ও প্রোটিন নিঃসৃত হয়ে আশপাশের সুস্থ কোষের ক্ষতি করতে পারে। যদি একই ঘটনা রক্তনালির ভেতরে ঘটে, তাহলে প্রদাহ, ধমনিতে চর্বি জমা, রক্ত জমাট বাঁধা, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্বের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে দূষণকে হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে প্লাস্টিক দূষণের সুনির্দিষ্ট প্রভাব এখনো পুরোপুরি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

শরীরে কী ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে?

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব মূলত শরীরের অভ্যন্তরে দেখা যায়। সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে— ত্বকে শুষ্কতা, লালচে ভাব ও জ্বালাপোড়া।, পেট ফাঁপা, অস্বস্তি ও হজমের সমস্যা।, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি।, কাশি ও শ্বাসকষ্ট।, হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত।, ওজন কমে যাওয়া।, স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা।, হাত কাঁপা বা স্নায়বিক জটিলতা।

তবে এসব বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন।

যুক্তরাজ্যের বিজনেস ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের প্লাস্টিক বর্জ্য বিশেষজ্ঞ মার্ক হল বলেন, মানুষের ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব নিয়ে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণা চলছে। তবে ইতোমধ্যে প্রাপ্ত তথ্য প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তার ভাষায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আমাদের চারপাশের পরিবেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাস থেকে খাবার—সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে দূষিত হচ্ছে। কিছু প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার কমানো গেলে ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব। তবে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যার সমাধান না হলে এ সংকট পুরোপুরি দূর হবে না।

অন্যদিকে, কাজাখস্তানের নাজারবায়েভ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোপ্লাস্টিক গবেষক ডানা ঝাক্সিলিকোভা জানান, মানুষের প্রায় সব অঙ্গেই ইতোমধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এমনকি প্লাস্টিকের পানির বোতল, কাগজের কাপ কিংবা টি-ব্যাগ থেকেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে বাঁচতে যা করবেন

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, দৈনন্দিন জীবনে কয়েকটি অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কিছুটা কমানো সম্ভব।

১. প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার সংরক্ষণ বা গরম না করে কাচ, সিরামিক বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করুন।
২. প্লাস্টিক মোড়কে থাকা ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খান।
৩. প্লাস্টিকের পানির বোতলের পরিবর্তে কাচ বা ধাতুর বোতল ব্যবহার করুন।
৪. প্লাস্টিকের পাত্রে মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করা এড়িয়ে চলুন।
৫. প্লাস্টিকের চপিং বোর্ড, স্ট্র এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বাসনের ব্যবহার কমান।
৬. টি-ব্যাগ, কাগজের কাপ ও প্লেটের পরিবর্তে নিরাপদ বিকল্প ব্যবহার করুন।
৭. সম্ভব হলে সুতি, লিনেন বা পশমের মতো প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক ব্যবহার করুন।
৮. ঘরের ধুলাবালি কমাতে নিয়মিত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করুন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান। তাই বর্তমানে কোনো "নিরাপদ মাত্রা" নির্ধারণ করা হয়নি। তবে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নয়, পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা প্লাস্টিক দূষণ এখন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও এক নীরব হুমকি। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগই হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই অদৃশ্য ঝুঁকি থেকে রক্ষার অন্যতম পথ।

সূত্র: বেকার হার্ট অ্যান্ড ডায়াবেটিস ইনস্টিটিউট ও ডেইলি মেইল।

Link copied!