ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

স্মৃতি থেকে আয়ু—সবকিছুর ইঙ্গিত দেয় এক পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬, ০৫:৪৩ এএম
ছবি: সংগৃহীত

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো সহজ একটি কাজ তখন অনেকের কাছেই চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত এক পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলন শুধু শরীরের ভারসাম্য রক্ষা নয়, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখা, স্মৃতিশক্তি উন্নয়ন এবং অকাল মৃত্যুঝুঁকি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শৈশবে এক পায়ে দাঁড়ানো স্বাভাবিক হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসে। সাধারণত ৯ থেকে ১০ বছর বয়সে মানুষ এক পায়ে দাঁড়ানোর দক্ষতা অর্জন করে। ত্রিশের শেষ দিকে এই দক্ষতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর ধীরে ধীরে তা হ্রাস পেতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০ বছরের বেশি বয়সে কেউ যদি কয়েক সেকেন্ড এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন, তবে তা তার সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও বার্ধক্য মোকাবিলার সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

আমেরিকান একাডেমি অব ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশনের পুনর্বাসন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ট্র্যাসি এসপিরিটু ম্যাকাই বলেন, এক পায়ে দাঁড়াতে অসুবিধা হওয়া মানেই ভারসাম্য প্রশিক্ষণ শুরু করার সময় এসে গেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের মাংসপেশি ক্ষয় বা ‘সারকোপেনিয়া’ নামের একটি স্বাভাবিক কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া শুরু হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০ বছরের পর থেকে প্রতি ১০ বছরে মানুষের মাংসপেশির ভর গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ কমে যেতে পারে। আশির কোঠায় পৌঁছানো প্রায় অর্ধেক মানুষের মধ্যেই ক্লিনিক্যাল সারকোপেনিয়া দেখা যায়। এই মাংসপেশি ক্ষয়ের সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের অবনতি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাসসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি জড়িত। যেহেতু সারকোপেনিয়া শরীরের বিভিন্ন মাংসপেশিকে প্রভাবিত করে, তাই এক পায়ে দাঁড়ানোর মতো ভারসাম্য পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি সহজেই অনুমান করা যায়।

মায়ো ক্লিনিকের মোশন অ্যানালাইসিস ল্যাবরেটরির পরিচালক কেন্টন কাউফম্যান জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা কমতে থাকে। বিশেষ করে ৫০ বা ৬০ বছরের পর এই অবনতি আরও দ্রুত হয়। তবে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে এই অবনতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

এক পায়ে দাঁড়ানোর গুরুত্ব শুধু পেশিশক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি মস্তিষ্কের কার্যকারিতার সঙ্গেও যুক্ত। এই ভঙ্গি ধরে রাখতে মস্তিষ্ককে চোখ, কানের ভেস্টিবুলার ব্যবস্থা এবং স্নায়ুর সোমাটোসেন্সরি ব্যবস্থার তথ্য একসঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে গেলে ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর সুস্থতার একটি সূচক। প্রতিক্রিয়ার গতি, দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনের দক্ষতা এবং ইন্দ্রিয় থেকে পাওয়া তথ্য দ্রুত সমন্বয় করার ক্ষমতার সঙ্গেও এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বয়সজনিত মস্তিষ্ক সংকোচন আগেভাগে শুরু হলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানায়, ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের আঘাতজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনিচ্ছাকৃতভাবে পড়ে যাওয়া, যার বড় একটি কারণ ভারসাম্যহীনতা। গবেষকদের মতে, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার অনুশীলন এই ঝুঁকি কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।

২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সে যারা এক পায়ে অন্তত ১০ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, তাদের পরবর্তী কয়েক বছরে যেকোনো কারণে মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রায় ২ হাজার ৭৬০ জন নারী ও পুরুষের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় রোগঝুঁকি নির্ধারণে এক পায়ে দাঁড়ানোর পরীক্ষাটিকে সবচেয়ে কার্যকর সূচক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার রোগীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। যারা এক পায়ে ভারসাম্য ধরে রাখতে সক্ষম, তাদের স্মৃতিভ্রম তুলনামূলকভাবে ধীর গতিতে অগ্রসর হয়। বিপরীতে, যারা পাঁচ সেকেন্ডও এক পায়ে দাঁড়াতে পারেন না, তাদের জ্ঞানীয় অবক্ষয় দ্রুত হয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

তবে আশার কথা হলো, নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে এই সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। বিজ্ঞানীরা একে ‘সিঙ্গেল লেগ ট্রেনিং’ নামে অভিহিত করছেন। এই অনুশীলন কোমর, নিতম্ব ও পায়ের মাংসপেশি শক্তিশালী করার পাশাপাশি মস্তিষ্কের গঠনগত উন্নয়নেও ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স সক্রিয় হওয়ায় স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়ে।

বিশেষজ্ঞরা ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের সপ্তাহে অন্তত তিন দিন এক পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলনের পরামর্শ দেন। তবে প্রতিদিনের রুটিনে এটি যুক্ত করলে সর্বোচ্চ উপকার পাওয়া যায় বলে মত তাঁদের। দাঁত ব্রাশ করা বা থালা–বাসন ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজের সময় কয়েক সেকেন্ড এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যাস সহজেই গড়ে তোলা সম্ভব।

গবেষকদের মতে, যোগব্যায়াম ও তাই চি’র মতো শরীরচর্চা, যেখানে নিয়মিত এক পায়ে ভারসাম্য ধরে রাখতে হয়, সেগুলো পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়ক। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নব্বইয়ের কোঠায়ও ভালো ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব।