ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ইরানে কেন কালো বৃষ্টি পড়ছে, এটা কতটা বিপজ্জনক?

রূপালী ফিচার
প্রকাশিত: মার্চ ১০, ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

বৃষ্টি মানেই স্বস্তি ও প্রশান্তি। দীর্ঘ খরার পর আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টির ফোঁটা মানুষের মনে এনে দেয় নতুন আশার বার্তা। কিন্তু সেই বৃষ্টি যদি স্বস্তির বদলে আতঙ্ক হয়ে নামে? যদি পানির বদলে আকাশ থেকে ঝরে পড়ে আলকাতরার মতো কালো ফোঁটা? সম্প্রতি ইরানে ঠিক এমনই এক অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে। উত্তর ইরানের আকাশ থেকে ঝরে পড়েছে কালো বৃষ্টি, যা স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক ভয় ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে।

গত ৭ ও ৮ মার্চ রাতে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলের বড় ধরনের সামরিক হামলার পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। হামলার ফলে রাজধানী তেহরান এবং পাশের আলবোর্জ প্রদেশের চারটি বড় তেল সংরক্ষণাগার এবং একটি তেল স্থানান্তর কেন্দ্রে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। রাতের আকাশ আগুনের লাল আভায় ঢেকে যায় এবং দিনের বেলায় পুরো শহর ঢেকে যায় ঘন কালো ধোঁয়ায়। রাস্তাঘাট, গাড়ি এবং বাড়ির বারান্দা পর্যন্ত কালো কালি ও ধোঁয়ায় ভরে যায়। এর মধ্যেই শুরু হয় বৃষ্টিপাত, কিন্তু সেই বৃষ্টির ফোঁটা ছিল অস্বাভাবিকভাবে কালো। ছাদ, রাস্তা এবং যানবাহনের ওপর জমতে থাকে ঘন কালো বৃষ্টির দাগ।

বিজ্ঞানীদের মতে, বড় অগ্নিকাণ্ডের ফলে তৈরি হওয়া ঘন ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে যখন বৃষ্টি নামে, তখন বৃষ্টির ফোঁটা বাতাসে থাকা ধোঁয়া, কাঁচ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক কণাকে সঙ্গে নিয়ে মাটিতে পড়ে। ফলে বৃষ্টির পানি কালচে বা কালো হয়ে যায়। তেল স্থাপনায় আগুন লাগার কারণে তৈরি হওয়া ধোঁয়ায় পোড়া কার্বনের কণা, পলিঅ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন, সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইডসহ নানা ধরনের ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে। এগুলো বাতাসের আর্দ্রতার সঙ্গে বিক্রিয়া করে অ্যাসিড বৃষ্টিও তৈরি করতে পারে।

এই কালো বৃষ্টি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। যদি এই পানি- পানির সরবরাহে মিশে যায় বা কেউ তা পান করে, তাহলে পেটে ব্যথা, বুক জ্বালাপোড়া বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে

এরই মধ্যে ইরানের অনেক বাসিন্দা গলা ব্যথা ও চোখে জ্বালাপোড়ার অভিযোগ করেছেন। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, কালো বৃষ্টির চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হতে পারে আগুন থেকে তৈরি হওয়া ধোঁয়া। কারণ ধোঁয়ার সূক্ষ্ম কণাগুলো শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে রক্তপ্রবাহে পৌঁছাতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ বা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

এই ধরনের দূষণ শুধু মানুষের শরীরেই নয়, পরিবেশের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিষাক্ত কণাগুলো মাছ, খামারের প্রাণী এবং কৃষিজ ফসলের শরীরে জমা হতে পারে, যা পরে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় কণাগুলো দ্রুত মাটিতে পড়ে গেলেও ক্ষুদ্র কণাগুলো বাতাসের মাধ্যমে শত শত কিংবা হাজার কিলোমিটার দূরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে এই ধোঁয়া ইরানের অন্যান্য অঞ্চল ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে এ হামলার পর ইরান তাদের স্থানীয় জনগণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া, বাইরে গেলে মাস্ক ও চোখ রক্ষার জন্য চশমা ব্যবহার করা এবং পানির স্বাদ বা রঙ অস্বাভাবিক হলে বিকল্প পানির উৎস ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় কোনো দেশের সীমানা মানে না; বাতাস ও পানির মাধ্যমে দূষণ ছড়িয়ে পড়ে অন্য অঞ্চলকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাই এই ধরনের ঘটনার প্রভাব শুধু একটি দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।