শহরের রাস্তা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো তখনও নেভেনি-ঠিক সেই সময়ে একদল মানুষের দিন শুরু হয়। ঘড়িতে রাত ৩টা কি ৪টা। যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, তখন রাজধানীর কারওয়ান বাজার বা প্রেসপাড়াগুলোতে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। আপনার ড্রয়িংরুমে বা দরজার নিচে প্রতিদিন ভোরে যে সংবাদপত্রটি পড়ে থাকে, তার পেছনের গল্পটি ঘাম এবং নিরলস পরিশ্রমের।
রাত ৩টার সেই চিরচেনা হাঁকডাক
পত্রিকা ছাপানোর কাজ শেষ হতে না হতেই শুরু হয় বিতরণের তোড়জোড়। প্রেস থেকে বান্ডিল করা পত্রিকাগুলো ট্রাক বা ভ্যানে করে পৌঁছাতে শুরু করে ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্টগুলোতে। সেখানে সারিবদ্ধভাবে বসে পড়েন শত শত সংবাদপত্র হকার ও এজেন্ট।
কারওয়ান বাজারের একজন প্রবীণ এজেন্ট বলেন, “সবাই যখন শেষ রাতের ঘুমে বিভোর, আমরা তখন সংবাদপত্রের পাতা গোছাতে ব্যস্ত। শীত, গ্রীষ্ম বা বর্ষা-আমাদের কোনো ছুটি নেই। এমনকি ঈদের দিনেও পত্রিকা না পৌঁছালে আমাদের পেটে ভাত জোটে না।”
ভাঁজ করা থেকে সাইকেল যাত্রা: এক মহাযজ্ঞ
পত্রিকাগুলো হাতে পাওয়ার পর শুরু হয় ‘সর্টিং’ বা বিন্যাস। মূল পত্রিকার ভেতরে ফিচার পাতা, ম্যাগাজিন বা বিজ্ঞাপনের লিফলেট ঢোকানো হয় দক্ষ হাতে। এরপর নির্দিষ্ট রুটের হকাররা তাদের সাইকেল বা মোটরসাইকেলের পেছনে পত্রিকার ভারি বোঝা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন গন্তব্যে।
একজন হকার জানান, তাকে প্রতিদিন অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ বাড়িতে পত্রিকা পৌঁছাতে হয়। ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা-এই তিন ঘণ্টা তার কাছে যুদ্ধের মতো। উঁচু তলার ফ্ল্যাট হোক বা গলি ঘুপচি, পত্রিকা যেন সঠিক সময়ে দরজায় পৌঁছায়, সেটিই তার একমাত্র লক্ষ্য।
বর্ষার জল আর শীতের কুয়াশা
সংবাদপত্র বিপণনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময় হলো বর্ষাকাল। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে পত্রিকাগুলো যেন ভিজে না যায়, সেজন্য প্লাস্টিকের মোড়কে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সেগুলো বহন করতে হয়। অন্যদিকে, শীতের তীব্র কুয়াশা মাড়িয়ে যখন পুরো শহর নিথর হয়ে থাকে, তখন সাইকেলের টুংটাং শব্দে হকাররাই জানান দেন যে শহরটি জেগে আছে।
ডিজিটাল যুগেও অটুট আবেদন
অনলাইনে মুহূর্তেই খবর পাওয়া গেলেও, ছাপানো কাগজের গন্ধ আর ভোরের চায়ে চুমুক দিয়ে পত্রিকা পড়ার যে ঐতিহ্য, তা আজও অম্লান। আর এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন সেই মানুষগুলো, যাদের কাজ শুরু হয় সূর্য ওঠার আগেই।
অদৃশ্য নায়কদের প্রাপ্তি কতটুকু?
খুব ভোরে কাজ শুরু করে ৮টার মধ্যে তাদের মিশন শেষ হয়। বিনিময়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে অনেকের সংসার চলে টেনেটুনে। তবুও মানুষের কাছে খবরের কাগজ পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে তারা এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি খুঁজে পান। তারা মনে করেন, তারা কেবল কাগজ বিলি করছেন না, বরং প্রতিদিন সকালে মানুষের মনে নতুন দিনের সূচনা করে দিচ্ছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন